বাংলাদেশিদের শরীরে বিশেষ জিন নিয়ে চাঞ্চল্য

মানবজমিন ডেস্ক

প্রথম পাতা ৮ জুলাই ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৪৯

কোভিড-১৯ রোগের সঙ্গে সংযুক্ত একটি ডিএনএ’র অংশবিশেষ ৬০ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথল উপমানব প্রজাতি থেকে মানুষের শরীরে এসেছে। ডিএনএ’র ওই বিশেষ অংশ করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। জিনোমের এই অংশবিশেষ মানুষের ক্রোমোজোম ৩’র ৬টি জিনজুড়ে বিস্তৃত থাকে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই জিনোমের রয়েছে রহস্যময় বিচরণ। সুইডেনের বিশ্ববিখ্যাত ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের জিনতাত্ত্বিকদের গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে।

তবে সবচেয়ে আশ্চর্য্যজনক বিষয় হলো, নিয়ান্ডারথলের এই বিশেষ প্রকরণ (ভ্যারিয়েন্ট) বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশিদের শরীরেই সবচেয়ে বেশি রয়েছে। বাংলাদেশের ৬৩ শতাংশ মানুষের মধ্যেই এই জিনোমের অন্তত একটি সংস্করণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়া জুড়েও তুলনামূলকভাবে এর বিচরণ বেশি।
এই অঞ্চলের ৩৩ ভাগ মানুষ বংশ পরম্পরায় এই জিন পেয়েছেন। তবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই সেগমেন্ট বা অংশবিশেষ তেমন পাওয়া যায় না। যেমন, ইউরোপের মাত্র ৮ শতাংশ ও পূর্ব এশিয়ার মাত্র ৪ শতাংশ মানুষের শরীরে এর উপস্থিতি রয়েছে। আর আফ্রিকার মানুষদের মধ্যে একেবারেই নেই। এই চাঞ্চল্যকর গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমসে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতাত্ত্বিক জশুয়া আকে বলেন, এই গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ৬০ হাজার বছর আগে যেই শংকর প্রজনন ঘটেছিল, তার প্রভাব আজও মানুষের মধ্যে পড়ছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, এমন সম্ভাবনাও রয়েছে এই নিয়ান্ডারথল জিন ক্ষতিকর। সামগ্রিকভাবেই এটি বিরল হয়ে উঠছে। আবার এ-ও সম্ভব যে, এই জিন দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের শরীরে থাকায় তাদের স্বাস্থ্যে উন্নতি ঘটিয়েছে। সম্ভবত এই জিনের উপস্থিতি থাকায় এই অঞ্চলের মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তভাবে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পেরেছে।

এই তত্ত্ব সত্য হলে বলতে হয় দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই এই রোগের বিরুদ্ধে এক ধরনের বা সীমিত মাত্রার হলেও সুরক্ষা আগে থেকেই ছিল। তবে এই তত্ত্ব এখন পর্যন্ত অনুমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

গবেষণার অন্যতম লেখক ও জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভ্যুলুশনারি অ্যান্থ্রোপলজির পরিচালক সভান্তে পাবো সতর্ক করে বলেছেন, ‘এখন অবধি এই বিষয়টি একেবারেই অনুমাননির্ভর।’ তবে এই সুরক্ষা বা আশীর্বাদ হয়তো প্রকৃতপক্ষে অভিশাপও হতে পারে।

গবেষকরা এখন পর্যন্ত স্রেফ বোঝার চেষ্টা করছেন যে, কেন  কোভিড-১৯ কিছু মানুষের জন্য খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠে, আর কিছু মানুষের ক্ষেত্রে একেবারেই সাদামাটা আচরণ করে। মোটাদাগে বলা হয়, বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে। নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি ঝুঁকিতে। এ ছাড়া সামাজিক বৈষম্যও বড় ফ্যাক্টর। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় এই ভাইরাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে বেশি। বিভিন্ন কারণেই কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবেই ডায়াবেটিসের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি বেশি। এ ছাড়া তাদের বসবাসের পরিস্থিতি ও তারা যেসব চাকরি করেন, সেসব কারণেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ও অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি তাদের বেশি।

এ ছাড়া মানুষের জিনেরও ভূমিকা আছে। গত মাসে গবেষকরা ইতালি ও স্পেনের রোগীদের মধ্যে তুলনা করেন। একদিকে ছিলেন গুরুতর অসুস্থ হয়েছিলেন এমন রোগী; অন্যদিকে সামান্য মৃদু সংক্রমিত ছিলেন এমন রোগী। গবেষকরা দেখলেন যে, মানুষের জিনোমের দুইটি অংশের সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি কম-বেশি হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। একটি হলো ক্রোমোজোম ৯, যেখানে রয়েছে এবিও। এবিও হলো এমন জিন, যা মানুষের রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ করে দেয়। এর প্রেক্ষিতেই বলা হয়েছিল যে, এ+ রক্তের গ্রুপ যাদের, তারা বেশি ঝুঁকিতে। আরেকটি জিন হলো ক্রোমোজোম ৩-এর এই নিয়ান্ডারথল সেগমেন্ট, যা বাংলাদেশিদের মধ্যে বেশি রয়েছে।

তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, এই জেনেটিক ফলাফল প্রতিনিয়ত হালনাগাদ হচ্ছে। নিত্য নতুন গবেষণা চলছে রোগাক্রান্তদের নিয়ে। যেমন, আগে বলা হতো যে রক্তের গ্রুপ এ+ হলে ঝুঁকি বেশি। তবে গত সপ্তাহে একদল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী নতুন উপাত্ত প্রকাশ করেছেন। সেই উপাত্ত অনুযায়ী এই রোগ গুরুতর হওয়ার সঙ্গে রক্তের গ্রুপের কোনো সম্পর্ক নেই।

বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের জিনতাত্ত্বিক ও এই গবেষক দলের সদস্য মার্ক ডেলি বলেছেন, ‘এবিও আদৌ কোনো ভূমিকা রাখে কিনা তা নিয়ে এখনো একমত হননি বিজ্ঞানীরা।’

এই পৃথক গবেষণাতে বরং দেখা যায়, রোগের সঙ্গে ক্রোমোজম ৩-এর ওই নিয়ান্ডারথল সেগমেন্টের সম্পর্কই বেশি। এতে দেখা যায়, এই সেগমেন্টের দু’টি নমুনা যাদের শরীরে আছে তাদের এই রোগে গুরুতর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩ গুণ বেশি। এই গবেষণা প্রকাশের পরই মাঠে নামেন সুইডিশ বিজ্ঞানী ড. হুগো যেভার্গ ও জার্মান বিজ্ঞানী ড. সভান্তে পাবো।

যেভার্গ ও পাবো বোঝার চেষ্টা করেন যে, এই ডিএনএ’র অংশবিশেষ কি নিয়ান্ডারথল উপমানবদের কাছ থেকেই মানুষ পেয়েছে কিনা। প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষদের পূর্বসূরিরা আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েন ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়। এই মানুষরা নিয়ান্ডারথল উপমানবদের সংস্পর্শে আসেন। এদের মাধ্যমেই নিয়ান্ডারথলদের ডিএনএ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এই ডিএনও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষের শরীরে ছিল, যদিও নিয়ান্ডারথলরা বিলুপ্ত হয়ে যায় অনেক আগেই।

নিয়ান্ডারথলদের বেশির ভাগ জিন মানুষের জন্য ক্ষতিকর ছিল। মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলা, এমনকি সন্তান জন্মদানকে দুরূহ করে দিতে এই জিনের ভূমিকা ছিল। এর ফলে প্রাকৃতিকভাবেই এই জিন মানুষ থেকে আস্তে আস্তে সরে যায়। এমন অনেক জিনই আমাদের শরীর থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে কিছু নিয়ান্ডারথল জিন রয়ে যায়। যেভার্গ, পাবো ও তাদের আরেক সহযোগী ড. জ্যানেট কেলসো আবিষ্কার করেন যে, এক-তৃতীয়াংশ ইউরোপিয়ান নারীর শরীরে নিয়ান্ডারথল হরমোন রিসেপ্টর রয়েছে। এর ফলে তাদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বেড়ে যায়। গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়।

ড. যেভার্গ ইতিমধ্যেই জানতেন যে, এখনো যেসব নিয়ান্ডারথল জিন মানুষের মধ্যে সাধারণভাবে পাওয়া যায়, সেগুলো ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর। আধুনিক মানুষ যখন হাজার হাজার বছর আগে এশিয়া ও ইউরোপে পাড়ি জমায়, তখন তারাও অনেক ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে নিয়ান্ডারথল ইতিমধ্যেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে রেখেছিল। ড. যেভার্গ খুঁজে পেলেন যে, ক্রোমোজোম ৩-এর যেই জিনটি  কোভিড-১৯ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে ফেলে, সেই জিন পাওয়া যায় এমন এক নিয়ান্ডারথল বর্গের মধ্যে যারা ৫০ হাজার বছর আগে ক্রোয়েশিয়ায় বসবাস করতো।

তাহলে প্রশ্ন হলো, যেই জিন থাকায় আমাদের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকার কথা, সেই জিনই আবার কীভাবে সংক্রমণকে গুরুতর করে দিচ্ছে?

ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতাত্ত্বিক টনি ক্যাপ্রা বলেন, এটি সম্ভব যে, ডিএনএ’র নিয়ান্ডারথল অংশবিশেষ প্রকৃতপক্ষে সুরক্ষাকবচ হিসেবেই কাজ করতো প্রথমে, এমনকি ভাইরাসের বিরুদ্ধেও। তিনি বলেন, ‘তবে আমাদের মনে রাখতে হবে এটা ছিল ৪০ হাজার বছর আগে। আর এখন তো আলাদা সময়।’

তার মতে, এমন হতে পারে যে, প্রাচীন ভাইরাসের বিরুদ্ধে যেই ইমিউন সিস্টেম কাজ করতো, সেটি নতুন এই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যেমন, কোভিড-১৯ রোগে যারা গুরুতরভাবে অসুস্থ হন, তাদের মধ্যে দেখা গেছে যে, তাদের ইমিউন সিস্টেম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বা অত্যধিকভাবে ভাইরাসকে নির্মূল করতে শুরু করে। আর সেটা করতে গিয়ে সুস্থ কোষও মরে যায়, আর শেষ পর্যন্ত মানুষের ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আর যার দরুন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকে মৃত্যুবরণও করেন।

পাবো বলেন, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ার আংশিক কারণ হয়তো হতে পারে তাদের শরীরে এই নিয়ান্ডারথল জিনের উপস্থিতি।

তবে নিয়ান্ডারথল সেগমেন্ট কি আসলেই কোভিড-১৯ রোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কিনা, তা স্পষ্টভাবে বুঝতে আরো গবেষণা প্রয়োজন। গবেষকদের হয়তো এখন প্রাচীন যুগের আধুনিক মানুষের কোনো ফসিল আবিষ্কার করতে হবে। তবেই হয়তো বোঝা যাবে কেন নিয়ান্ডারথল জিন কিছু মানুষের মধ্যে আছে, আর কারও কারও মধ্যে নেই। ড. যেভার্গ বলেন, আমাদের মনুষ্য প্রজাতির মধ্যে ডিএনএ’র এই অংশবিশেষের ৬০ হাজার বছরের পথপরিক্রমা থেকেই হয়তো বোঝা যাবে কেন এই জিন এখন এত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। তিনি বলেন, ‘এই জিনের বিবর্তনমূলক ইতিহাস হয়তো আমাদের কিছু সূত্র দিতে পারে।’

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

M H Rashid

২০২০-০৭-০৭ ১৪:৫১:৩৭

এসব আমাদেরকে আতংকিত করে সুবিধা নেওয়া চে।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

সিনহার মায়ের কান্না

এটাই যেন শেষ ঘটনা হয়

১১ আগস্ট ২০২০

ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি

কোতোয়ালি থানার ওসি’র বিরুদ্ধে মামলা

১১ আগস্ট ২০২০

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেছেন ...

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তথ্য

কাছ থেকে ৪টি গুলি করা হয়েছিল সিনহাকে

১০ আগস্ট ২০২০

সাবমেরিন ক্যাবলে জটিলতা ইন্টারনেটে ধীরগতি

১০ আগস্ট ২০২০

দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের (সি-মি-উই-৫) পাওয়ার ক্যাবল কাটা পড়ায় দেশে ইন্টারনেটে ধীরগতি বিরাজ করছে। পটুয়াখালীতে সাবমেরিন ...



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত