সিটি অব রোমান্সে তিনদিন

কাজল ঘোষ, ইউননান (চীন) থেকে ফিরে

অনলাইন ২৫ মে ২০২০, সোমবার, ৩:৪৭ | সর্বশেষ আপডেট: ৩:৫৪

ভাবুন তো হাঁটছেন হঠাৎ মেঘেরা আপনাকে ছুঁয়ে দিয়েছে। মিষ্টি রোদের ফাঁকে তুলতুলে মেঘ পাহাড়ে লুকিয়েছে। চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড় সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে আকাশের সঙ্গে মিলে রং বদলাচ্ছে। মুন লেকের বাতাসে মন উদাসী হাওয়ায় রঙিন স্বপ্নে পাল তুলেছে। দিন গিয়ে রাত এসেছে। তাতে কে বাদ সেধেছে? চারপাশে আলো ঝলমল করছে। ত্বালির এনসিয়েন্ট ক্যাপিটাল সিটি (পুরনো রাজধানী) যেন আপনাকেই খুঁজছে। এ যেন দিনের চেয়েও রঙিন।
দোকানিরা নানা পণ্যের পসরা নিয়ে বসে আছে। দিন-রাতের বালাই নেই। স্থানীয়রা তাই বলে থাকে ত্বালি কখনো ঘুমায় না।
শহরের এক পাশে আরহাই লেক। অন্য পাশে মাইলের পর মাইল ফুলের বাগান। চাংশান পাহাড়ের ১৯টি চূড়া, ১৮টি সুদৃশ্য ঝরনা। মাঝেমধ্যেই ত্বালি ক্লাউড। প্রকৃতির এক অন্যরকম দ্যোতনা। যেখানে আকাশ-পাহাড়-মেঘের মিতালী। তিনবছর আগে শিক্ষাসফরে গিয়ে এই শহরটি দেখার সুযোগ হয়েছে। তিনদিন ত্বালিতে থাকবো এটা আমাদের ট্রাভেল শিডিউলে লেখা ছিল। কিন্ত এই তিনদিন যে কিভাবে চলে গেল তা টেরই পাইনি। বাস যখন ত্বালি ডাউন টাউনে প্রবেশ করে তখন যে ধরনের আহা, দারুণ, দ্যাখ দ্যাখ শুনছিলাম ঠিক ফেরার দিন উল্টোটাই হলো। এক মন খারাপ করা বহর নিয়ে ফেরা।

খুনমিং থেকে তিন শ’ কিলোমিটার দূরের এই শহরটি যেতে আমাদের সময় লেগেছিল পাঁচ ঘণ্টা। মাঝখানে তিনবার চায়ের বিরতি আর একবার দুপুরের ভোজ। মাঝেমধ্যেই গাইড আমাদের বলছিল ত্বালি শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা। কুবলাই খাঁ আর তার দৌহিত্র চেঙ্গিস খাঁরা রাজত্ব করেছেন ত্বালিতেই। একে বলা হয় সিটি অব রোমান্স। একথা শুনতেই আমাদের অনেকের মধ্যে হাসির ঝিলিক। মনে হয় তারা হারিয়ে যাওয়ার প্রস্ততি নিয়েই যাচ্ছে ত্বালিতে। জোরে করতালি। পেছন থেকে দুই একজনের শিস। কিন্তু কোনো কিছুই ই-কে থামাতে পারেনি। কুবলাই খাঁর সময় থেকেই ত্বালিতে মুসলিম বা হুয়ে সম্প্রদায়ের বাস। এখানকার মোট জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই পাই সম্প্রদায়ের। এরাই মূলত এখন ত্বালির সংস্কৃতি জীবনাচারণে বেশিরভাগ অংশের নেতৃত্বে। এরা চীনের একমাত্র স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ত্বালির বাসিন্দা হিসেবে গৌরববোধ করে। ত্বালি কিংডমের প্রতিষ্ঠাতাও এই বাই জনগোষ্ঠীর লোকেরাই।
এ অঞ্চলে একসময় বৌদ্ধ রাজারা শাসন করেছে। সে সময় বিকাশ ঘটেছে বৌদ্ধদের। চীনে বৌদ্ধধর্ম চার ভাগে বিভক্ত। তারমধ্যে ত্বালিতে বাস করে যারা তাদের বলা হয় আচালি বুদ্ধ মতের অনুসারী। তাওয়িজম, বুদ্ধিজম আর কনফুশিয়াসিজম এই তিন মতের অনুসারীরা একসঙ্গেই ত্বালির বিভিন্ন স্থানে বাস করছে। কোনো কোনো টেম্পলে একসঙ্গে এই তিন মতবাদের প্রধানদের প্রতিকৃতি ঠাঁই পেয়েছে। আর ত্বালির অন্যতম দর্শনীয় স্থান থ্রি প্যাগোডা তো মিং শাসনামলে বৌদ্ধ রাজাদের যুগের সাক্ষ্য হিসেবে আজও অমর হয়ে আছে। গাইডের মুগ্ধ করা সব তথ্যের ফাঁকে ফাঁকে তাকিয়ে দেখছিলাম ইউনানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। পাঁচ ঘণ্টার এই পথ পুরোটাই পাহাড়ি। এক পাহাড় থেকে যেন আরেক পাহাড়ে চলছে আমাদের বাস। আর হঠাৎ হঠাৎ বাস ঢুকে পড়ছে বিশাল বিশাল টানেলে। এমনও হয়েছে পনের বিশ মিনিট আমাদের বাস পাহাড়ের নিচে তৈরি টানেল দিয়ে ছুটে চলছে।

পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করে চীনের এথনিক জনগোষ্ঠী। যারা আজকের উন্নত চীন দেখছি। তার উল্টো চিত্র এসব এলাকায়। এখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দারাই আধুনিক জীবনের সঙ্গে নিজেদের এখনো সম্পৃক্ত করতে পারেনি। পাহাড়ের অনেক এলাকা এখনো এতটাই দুর্গম যে, সেখানে ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার ব্যবস্থা নেই। নেই হাট-বাজারও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমরা যে সিল্ক রোডের কথা বইপত্রে পড়েছি। বা যে টি হর্স রোডের কথা বইপত্রে জেনেছি। সেই রোডটি এই ত্বালি শহরের ওপর দিয়েই চলে গেছে। একসময় এশিয়ার সকল ব্যবসায়ী চা আর সিল্ক নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পাড়ি দিতো এখান দিয়েই মাইলের পর মাইল। ত্বালি ছিল তাদের বিশ্রাম স্থান।
ত্বালির এনসিয়েন্ট সিটিতে হতো বিকিকিনি। আশপাশের সীমান্তবর্তী ভিয়েতনাম, তিব্বত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার হয়ে এই পথ বিস্তৃত ছিল ভারত পর্যন্ত। এই সিল্ক রোড দুইভাগে বিভক্ত ছিল। একটি সাউথ সিল্ক রোড। অন্যটি নর্থ সিল্ক রোড। যার মাধ্যমে নতুনভাবে আবারো এশিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে এই পথ নিয়ে চিন্তা করছে চীন সরকার। গাইড ই একসময় থেমে যায়। কারণ, আর কথার দরকার নেই। এখন শুধুই পরখ করে দেখার পালা। ত্বালি সত্যি সত্যিই বর্ণনার চেয়ে সুন্দর। মেঘেদের দলবল আমাদের দলবলের মাথা খারাপ করে দিয়েছে কিছু সময়ের মধ্যেই। মুন লেকের পারে কিছু সময় কাটিয়ে আমরা যাই এনসিয়েন্ট টাউনে।

চীনা ভাষায় ত্বালি এনসিয়েন্ট সিটিকে বলা হয় ইউচেং সিটি। এই সুরক্ষিত শহরটি ছিল দক্ষিণ-পশ্চিম চীন থেকে সিল্করুটের সঙ্গে মূল সংযোগস্থল। একসময় এখানে ছিল সরকারি দফতর আর সেনা ছাউনি। এর দেয়াল সাড়ে সাত মিটার অর্থাৎ প্রায় চব্বিশ ফুট উঁচু এবং প্রায় উনিশ ফুট চওড়া। দেয়ালের মোট পরিধি ছয় কিলোমিটার। এখানে ঢোকার জন্য চারদিকে রয়েছে চারটি বিশাল গেট। অবিশ্বাস্য চওড়া দেয়ালের ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গের মতো ঢোকার পথ আর তার ওপর চীনা স্থাপত্যরীতির দুস্তর ছাদওয়ালা গেট টাওয়ার অবস্থিত। এক সময় দেয়ালের ওপরও ছিল চারটি এরকম গেট যা ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে বহু পরিবর্তনে বদলেছে অনেক কিছু। সবশেষ ১৯৮২ সালে মেরামত করা হয় উত্তর এবং দক্ষিণ দিকের গেট ও টাওয়ার দু’টি। ভেতরে ঢুকলেই চমৎকার বর্ণিল ফুলের বাগান আর তার আশপাশে পর্যটকদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ফুলের মতোই সেজেগুজে অপেক্ষামাণ বাই তরুণীরা। দেয়ালঘেরা প্রাচীন শহরটির ভেতরে গাড়ি চলাচলের নিয়ম নেই। ফলে পর্যটকরা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারেন। আমরাও বিকালের কনে দেখা আলোয় দল বেঁধে বেরিয়ে ফিরি এন মানে নিউইয়র্ক হোটেল থেকে। মনের ভেতরে অনেক না দেখা আর অনেক না জানা উঁকি দিচ্ছিল। কে আটকে রাখে আমাদের সেই পথ থেকে ফেরাতে। তৃষ্ণার্থ মনের ক্ষুধা মেটাতে আমরা দলে দলে হারিয়ে যাই পুরনো সেই রাজধানীর আলোকিত রজনীতে। আমাদের ঘরে ফেরার কোনো তাড়া নেই। মধ্যরাতেও যেন ফকফকা দিন। ত্বালির ইরং স্ট্রিট (ফরেন স্ট্রিট) চব্বিশ ঘণ্টাই এভাবে প্রস্তুত থাকে পর্যটকদের জন্য।

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত