বেদে পল্লীর করুণ ঈদ

শা‌কিল আহ‌মেদ

অনলাইন ২৫ মে ২০২০, সোমবার, ২:০৩

মানুষ নিয়ে যাদের খেলা সেই মানুষের কাছ থেকেই চলতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। ঘরবাড়িতে তো দূরের কথা কাছাকাছি যাওয়া নিষেধ। এদিকে দুই মাস ধরে কাজ বন্ধ। অনেকের ঘরেই রয়েছে খাবার সংকট। এর মধ্যে চলে এসেছে ঈদ। কিন্তু ঈদের এই আনন্দ যেন ছুঁতে পারেনি সাভার পোড়াবাড়ির বেদে সম্প্রদা‌য়ের।
ঢাকার নিকটবর্তী পৌর শহর সাভারের ১নং ওয়ার্ডে বসবাস করছে তিন হাজার বেদে পরিবার। যার অধিকাংশই মুসলিম। প্রতি পরিবারে পাঁচ থেকে সাত জন সদস্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে ১৫ হাজার মানুষ বসবাস করে এই পল্লীতে। এদের কাজ হচ্ছে হাটে বাজারে ও বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে সাপ খেলা দেখানো। বোনাজি গাছ, পাথর, আংটি, তাবিজ ইত্যাদি বিক্রি করা। এবং সিঙ্গা লাগানোসহ কবিরাজি সব তদবির দেয়া। পুরো কাজটাই করতে হয় মানুষ একজায়গায় জরো করে। তাবিজ কবজ বিক্রি করেই মূলত এদের আয় রোজগার হয়। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলছে বেদে সম্প্রদায়ের সংসার।
কিন্তু মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে গত দুই মাস ধরে কর্মহীন হয়ে পড়েছে তারা। একসাথে অনেক লোকসমাগম না করার জন্য সরকার থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকায় চরম বিপাকে পড়েছে বেদে বাসিরা। এই মুহূর্তে কোন বাড়িতে গেলে করোনার ভয়ে তাদেরকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় হয়। তাই দুমাস ধরে কর্মহীন অলস সময় পার করছে বেদে সম্প্রদায়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই মানবতার জীবন যাপন করছে। কিছু লোক সাহায্য পেলেও বেশিরভাগেরই ভাগ্যে জোটেনি কোন সহায়তা। অপরিচিত কাউকে দেখলেই ছুটে আসে ত্রানের আশায়।
সাভার বেদে পল্লীর ছোট ওমরপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাহিরে বসে গল্প করছে বেশ কয়েকজন বেদে মহিলা। এরমধ্যে একজন হলো আরমিনা বেগম (৩৫) তিন বছর আগে তার স্বামী মারা গেছে। ছোট দুটো মেয়ে নিয়ে জীবন সংগ্রামে একাই লড়ছেন তিনি। লকডাউন থাকায় হাতে কোন কাজ নেই। আরমিনা বলেন, "দুই মাস ধরে গ্রাম করতে পারিনা, গ্রামে গেলে করোনার ভয়ে সবাই আমগো তারাইয়া দেয়, সরকারি কোন সাহায্য পাই নাই" দুই মেয়ে নিয়া খুব কষ্টে আছি" রমজান ( বেদে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ) ভাইয়ের অফিসে এক ম্যাডাম আইছিল সে আমাগো কইছে বিকাশ নাম্বার দিতে টাকা দিব সবাইরে। সেই আশায় দুইশ টাকা খরচ কইরা বিকাশ সিম কিনছি, প্রতিদিন আশায় থাকি কিন্তু টাকা আসেনা। একই অভিযোগ করেন সদে বেগম (৫০) নামে আর একজন বেদে। তিনি বলেন, রোজার মাস খুব কষ্ট করে সেহরি খাইয়ে রোজা ছিলাম। আমারও স্বামী নাই। এই এলাকার কেউই সাহায্য পাই নাই। কাজ না থাকায় ঘরে খাবার নাই। কয়েক বার ভোটার আইডি কার্ড নিছে,তালিকা করছে, বিকাশ নাম্বার নিছে কিন্তু সাহায্য আসলে আমাগো দেয় না। আমরা খুব কষ্টে আছি। এভাবে আর কতদিন চলমু। ঈদে না খেয়ে থাকতে হবে।
মোঃ আফহান নামের এক সাপুড়ে বলেন, আমাদের সাপ খেলা এখন বন্ধ । অন্য পেশায় তো মুখে মাস্ক পরে কাজ করা যায়। আমরা তো তাও পারি না। লোক জরো না করলে আমাদের আয় নেই। দুই মাস ধরে খুব কষ্টে আছি। কেউ ত্রান দিতে আসলে একশো জনের মধ্যে ৩০জন পায় তাও মুখ চিনে দেয়। আমরা কিছুই পাইনা। গরিবের আবার কিসের ঈদ। বেদে পল্লীর কাঞ্চনপুর এলাকার বাসিন্দা শফিক কামাল বলেন, দুই মাস কাজ বন্ধ, ঘরে খাবার নেই, আমরা কোন সাহায্যও পাই নাই। এবার আর আমাদের ঈদ নাই। জাহিদুল ইসলাম নামে আর এক সাপুড়ে বলেন, সাপ খেলা মানুষের ভিড়ে দেখাই কিন্তু এখন দুইজন মানুষ একসাথে দাঁড়াতে দেয় না, তাহলে আমরা কিভাবে বাঁচবো? ত্রান যা আসে তা নেতারা খেয়ে ফেলে। সফুর উদ্দিন নামে এক বৃদ্ধ সাপুড়ে বলেন, আগে সাপ খেলা দেখাইতাম কিন্তু বয়সের কারণে এখন আর যাইতে পারিনা। দুই মাস ধরে খুব কষ্টে আছি। কেউ যদি আমাদের সাহায্য করে তাহলে কারো মাধ্যমে না দিয়ে যেন সরাসরি দেয় তাহলে আমরা একটু বাঁচতে পারবো।
এবিষয়ে বেদে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি রমজান আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, এখানে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার বেদে পরিবার রয়েছে। বাকিরা লকডাউনের কারনে বিভিন্ন জেলায় আটকা পড়েছে। লকডাউনের শুরুতে আমার তালিকা করেছি, যাদের ঘরে এক সপ্তাহ চলার মত খাবার নেই তাদেরকে আগে দিয়েছি । পনের দিন একমাস যারা চলতে পারবে তাদেরকে পরে দিয়েছি। এখানে খাবার সংকট আছে, বেশিরভাগই গরিব মানুষ। আমাদের নিজস্ব কোন ফান্ড নেই। সবার কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে আমাদের চলতে হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে যখন যে সাহায্য পাচ্ছি সবার মাঝে তা ভাগ করে দিচ্ছি, যাতে সবাই চলতে পারে। কারণ এই মুহূর্তে সবার কাজ বন্ধ আবার ঈদ চলে আসছে।
জানা যায়, একটা সময়ে বেধে পল্লীতে মারামারি, হানাহানি ও মাদকের রমরমা বেচাকেনাসহ চলত নানা অপরাধ। আসামি ধরতে গিয়ে বিপাকে পরতো পুলিশ। ছিল না ভালো কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষার আলো। এ সময় বেদে সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ২০১৪ সালে উদ্যোগ নেন তৎকালীন ঢাকা জেলা এসপি হাবিবুর রহমান। (বর্তমান ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ)। তার হাত ধরে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে এই সম্প্রদায়। সরকারী ও বেসরকারি চাকরি পড়ালেখাসহ সবকিছুতে অংশগ্রহণ করছে বেদে সন্তানেরা। ডিআইজি হাবিবুর রহমানকে নিজেদের অভিভাবক মনে করেন তারা। এবিষয়ে হাবিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের মূল কাজ হচ্ছে সাপ খেলা বানর খেলা তাবিজ কবজ ইত্যাদি বিক্রি করা। এই রোজগার দিয়েই মূলত তাদের সংসার চলে। এদের হাতে জমানো এমন কোন টাকা থাকে না, যা দিয়ে তারা দুই তিন মাস চলতে পারবে। তাদের অবস্থা অনেকটাই দিন আনা দিন খাওয়ার মত। কিন্তু লকডাউনের কারণে তারা কোনো মানুষের কাছে যেতে পারছেনা। তাদের আয়-রোজগার সম্পূর্ণ বন্ধ। তাদের মধ্যে অনেকের ঘরেই খাদ্য সংকট রয়েছে। আমি। সাধ্যমত তাদেরকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। সরকার থেকেও তাদেরকে সহায়তা করেছে। বিভিন্ন জেলায় আটকাপড়া অনেক বেদে ফোন দেয় সহয়তার জন্য। যখন যতটুকু পারছি তাদেরকে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করছি। কিন্তু কাজকর্ম না থাকলে এভাবেই বা কতদিন চলবে? অনেকেই ফোন করে তাদের কষ্টের কথা বলতেছে। আমি মনে করি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই বিষয়ে এগিয়ে আসা উচিত।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

SJ

২০২০-০৫-২৫ ০৩:৫২:২১

লক ডাউন আউট তো এই জন্যই করতে হবে। তবে সীমাবদ্দতায়। যুদ্ধ যখন লেগে যায়, সজ্জিত অস্র নিয়ে চুপচাপ বসে থেকে যুদ্ধ জয় কারো হয়? লক ডাউনে ততো বেশী উপকার দিবে না, করোনা পরিস্থিতিতে। যার সেইফ তার কাছে। লক ডাউন একটা মুখস্ত কথা। পরিস্তিতি পরিপন্থী। যে যত বেশী সীমাবদ্ধ থাকবে সে ততো বেশী ভালো থাকবে। অতি উল্লাস থেকে বিরত থাকতে হবে প্রতিটা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে। বলি সকল দায়িত্বরতদের, সুচিন্তায় গবীর হতে হবে। অক্সিজেন বাড়াতে হবে পদক্ষেপ নিয়ে। সকল অফিস ও সকল কাজ কর্মের সীমানা বাধ হবে সূর্য উদয় হইতে সূর্য অস্ত পর্যন্ত, জরুরী বিভাগ ব্যতীত। মনেরাখতে হবে ফজরের নামাজের পরে কর্মজীবীরা অফিসে যাবার ব্যাস্ততায় পরবে। অফিস স্টার্টিং টাইম দিতে হবে এমন হিসাব করে। ইহা ভবিষ্যত স্থায়ী সমাধান, স্বাস্থসম্মত, ব্যাখ্যা অনেক লম্বা। দায়িত্বরতরা যদি এমনটা করতে চায়, এমন কাঠামো গঠনে যদি দ্বিধাদ্বন্দে পরে। আমি বিনা শর্তে কাঠামো গঠন করে দিতে চাই, যাহা হবে সম্মানিত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অফিস কাঠামো। বিনিময়ে কিছু চাই না। জানি আমি, এমনটা হবার নয়, তবুও বলে যাই। আর যদি এমন টা হয়েই যায় তবে কথা বলবো শুধুমাত্র একজনের সাথে, অন্য কেউ থাকতে পারবে না।।

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত