‘এই বিপদজনক খেলায় শ্রমিকরা দাবার গুটিমাত্র’

প্রফেসর আলী রীয়াজ

ফেসবুক ডায়েরি ৫ এপ্রিল ২০২০, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:২১

গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের তাদের কারখানায় যোগ দেবার জন্যে ডেকে আনায় শিল্পের মালিকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার হচ্ছেন। এই মালিকরা যে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছেন সেই বিষয়ে পরে বলি। কেন শ্রমিকরা তাদের জীবন বিপন্ন করে ঢাকামুখি হয়েছেন তা আমার-আপনার জানার কথা। জীবন ও জীবিকার মধ্যে তাদের জীবিকাকেই বেছে নিতে হয়েছে, কারন জীবিকা ছাড়া তাদের জীবন রক্ষার উপায় নেই। গত ১০ দিনে সরকার বা মালিকরা কি করেছেন যাতে তাদের মনে হবে যে ঘরে বসে থেকে বাঁচা যাবে? তাদের কাছে চাল-ডাল-সাহায্য পৌছানো গেছে? সরকারের মন্ত্রী-নেতারা সরকারী ‘ত্রান’ দিচ্ছেন এমন ভাবে যেখানে সাংবাদিকরা অলৌকিকভাবে ক্যামেরা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। এইসব ত্রান বাংলাদেশের উন্নয়নের এই সব কারিগরদের কাছে পৌছাবার কথা নয়। দেশে সরকারী হিসেবেই আছে ৬ কোটি দরিদ্র। হতদরিদ্র হচ্ছে ১ কোটি ৬৮ লাখ।
তাদের কাছেই কী পৌচেছে? মনে করে দেখুন এই শ্রমিকদের কেন এই বিপদ মাথায় নিতে হয়। ২০১৭ সালে নারী শ্রমিকদের ওপর গবেষণা করে চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) বলছিলো ৮০ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন; কারন তারা যথেষ্ট খেতে পারেন না। মনে আছে কি এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় একটি বড় হোটেলে ‘পোশাক শিল্পখাতে মৌলিক পুষ্টি ও খাদ্য সরবরাহ বিষয়ক প্রশিক্ষণ’ বিষয়ক কর্মশালা হয়েছিল। সেখানে জানা গিয়েছিলো যে ৪৩ শতাংশ শ্রমিক দীর্ঘ মেয়াদী অপুষ্টির শিকার। কিন্ত তা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন হয়েছিলো কেন জানেন? সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো –“এতে পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের ২০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।“ তাদের স্বাস্থ্য নয়, জীবন নয় – উৎপাদনশীলতা হচ্ছে উদ্বেগের বিষয়। ফলে আজকে এখন তারা যা করছেন তার বিকল্প ছিল না। ঐ উৎপাদনশীলতার অজুহাতেই এখন মালিকরা তাদের ডেকে নিয়ে এসেছে। মালিকদের এই আচরন কেবল অমানবিক নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যে হুমকি। তাদের প্রশ্ন করুন। কিন্ত সাথে সাথে এটাও লক্ষ্য করুন সরকারের ভূমিকা কি। ১ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, ‘প্রয়োজনে ... রপ্তানীমুখি শিল্পকারখানা চালু রাখতে পারবে’। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ৩১টি নির্দেশের ২৯ নং-এ বলা হয়েছে “শিল্প মালিকগণ শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে উৎপাদন অব্যাহত রাখবেন”। এই নির্দেশনার ফাঁক গলিয়েই গার্মেন্টস কারখানার মালিকরা সুবিধা নিচ্ছেন। কিন্ত সেটাই কি কারন? এর পেছনে কি সরকারের ওপরে চাপ প্রয়োগের কৌশল কাজ করছে? সময় এবং ঘটনা প্রবাহ দেখলেই বুঝতে পারবেন। গার্মেন্টস মালিকরা সরকারের কাছে চেয়েছিল ‘প্রণোদনা’। মানে টাকা দেয়া হবে কিন্ত তাদের ফেরত দিতে হবেনা। সরকার বলেছে দেওয়া হবে ঋণ; ঋণের টাকা গার্মেন্টস মালিকদের শোধ দিতে হবে ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ, অনেকে বলছেন তাদের প্রায় ৪ শতাংশ ব্যয় হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে নাখোশ গার্মেন্টস মালিকরা। তাই সরকারের কাছ থেকে ‘প্রণোদনা’ নেওয়ার কৌশল হিসেবেই এখন এই শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন করা হয়েছে, দেশের জনস্বাস্থ্যকে ঝুকির মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। দেশকে জিম্মি করা থেকে এটি কী অর্থে ভিন্ন? এই বিপদজনক খেলায় গরীব শ্রমিকরা দাবারগুটি মাত্র; তারা বাঁচলো কি মরলো তাতে কার কি আসে যায়!
(আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো। লেখাটি তার ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া)

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

MD ARIFUL HASAN

২০২০-০৪-০৯ ১২:৩০:০৮

প্রণোদনা’ নেওয়ার কৌশল হিসেবেই এখন এই শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন করা হয়েছে, দেশের জনস্বাস্থ্যকে ঝুকির মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। দেশকে জিম্মি করা থেকে এটি কী অর্থে ভিন্ন? এই বিপদজনক খেলায় গরীব শ্রমিকরা দাবারগুটি মাত্র; তারা বাঁচলো কি মরলো তাতে কার কি আসে যায়!

এফ এম ইফতেখার

২০২০-০৪-০৪ ২১:৪৮:১৮

কিযে বলেন। কিসের দায়, কার দায়, কে নিবে? উনারা ডলার আনেন তাই আমরা বেঁচে থাকি। উনারা নিজেদের দায়মুক্ত মনে করেন। না হলে এত সাহস কি করে হয়।

md.Unus ali.

২০২০-০৪-০৫ ১০:৪৩:৩৬

its is very dissaponted and wrong doing for germents worker.

Abdur Rahim

২০২০-০৪-০৫ ১০:৩১:৫৭

পানি সব সময় নিচের দিকে গড়ায়।তাই গরিব শ্রমিকরা মানুষ কি?

মাসউদুল গনি

২০২০-০৪-০৫ ১০:২৭:৪২

গার্মেন্টস খুললে বাকী সব প্রতিষ্ঠানও খোলা হউক। লক ডাউন জাহান্নামে যাক। আমরা সাধারন মানুষ এক দিন কাজ না করলে চুলা জ্বলবে না। গার্মেন্টস মালিকরা রক্ত বেচে বহু কামাই করছে,তাদের সমস্যা হবে না...........

monirulalam

২০২০-০৪-০৪ ২০:০৮:১৫

পানি সব সময় নিচের দিকে গড়ায়।তাই গরিব শ্রমিকরা মানুষ কি?এদের টেনে হিছরে বলপূর্বক এনে ,এখন বলছে, ১১ তারিখ পর্যন্ত বন্দ।হায় বড়োলোক আল্লাহর বন্দারা

আপনার মতামত দিন

ফেসবুক ডায়েরি অন্যান্য খবর



ফেসবুক ডায়েরি সর্বাধিক পঠিত