এনকাউন্টারই কী সমাধান

স্টাফ রিপোর্টার

প্রথম পাতা ১৬ জানুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৫৫

সারা দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া ধর্ষণকাণ্ড রোধে দায়ীদের এনকাউন্টারে দেয়ার দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। মঙ্গলবার কয়েকজন সিনিয়র সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে এমন দাবি তোলেন। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এমন দাবি তোলায় এর সমালোচনা করেছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা। বলছেন, সংসদে এমন দাবি তোলায়  আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে বিচারবর্হিভূত হত্যা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, আইন প্রণেতারা এমন বেআইনি দাবি তুলতে পারেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রিয়াজ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশে আইন প্রণেতারাই সংসদের অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনের প্রতি এত বড় অবজ্ঞা দেখিয়েছেন বলে আমার জানা নেই।

সংবিধানের প্রতি এবং আইনানুগ বিচারের প্রতি একে এক হুমকি ছাড়া আর কিছু বলার অবকাশ নেই। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা আছে যে ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’ (২৭ অনুচ্ছেদ); বলা হয়েছে যে,‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে’ (অনুচ্ছেদ ৩১)। ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না’ (অনুচ্ছেদ ৩২)।
এই সংবিধানকে সমুন্নত রাখাই হচ্ছে সংসদ সদস্যদের কাজ। তারা শপথ গ্রহণের সময়ে বলেছেন,‘আমি, সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি, তাহা আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিবো।’ আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারাবদ্ধ সংসদ সদস্যরা এখন বিচার-বহির্ভূত হত্যার জন্য বলছেন।

এদিকে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভুত হত্যা করার দাবির নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংবিধান স্বীকৃত আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক এ ধরনের বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের সকল বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সমপ্রতি আশংকাজনক হারে বেড়ে চলা ধর্ষণ প্রতিরোধে জাতীয় সংসদে আলোচনায় সম্মানীত সংসদ সদস্যদের একাংশের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশের অংশ হিসেবে অপরাধটি দমনে ক্রসফায়ারে হত্যার দাবি তুলে ধরা হয়, যা গভীরভাবে নিন্দনীয় ও উদ্বেগজনক। একই আলোচনায় অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে এই পন্থার ‘কার্যকারিতা’ তুলে ধরে তারা তা এক্ষেত্রেও প্রয়োগে জোর দাবি জানান, যা একদিকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যাবৎ উত্থাপিত বিচারবহির্ভুত হত্যার অভিযোগের যথার্থতা প্রমাণ করে। অপরদিকে বেআইনি এ পদ্ধতির পক্ষে আইনপ্রণেতাদের নিন্দনীয় উৎসাহ ও ঢালাও সমর্থন তুলে ধরে, যা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অশনি সংকেত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় এ ধরণের বেআইনি ও অযাচিত দাবিকে সংবিধানস্বীকৃত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পথে অপ্রতিরোধ্য অন্তরায়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দানের প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায়না।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া বলেন, সংসদে তারা যা বলেছেন তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি সমাজে বিচারহীন ভাবে একটি মানুষকে মেরে ফেলা কখনো সভ্য সমাজে হয় না। বরং এমন বক্তব্য নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাবে। আমার কাছে মনে হয় ভোক্তভোগীদের কোনো ধরণের উপকারই হবে না। তারা হচ্ছেন আইন প্রণেতা, তাদের কাজ আইন প্রণয়ন করা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। তারা যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা এই দেশের বিচার ব্যবস্থাবে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এমনটা করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ধর্ষণের প্রতিকার হিসেবে সাধারণ মানুষরা বলে আসছিলেন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হোক বা ক্রসফায়ার দেয়া হোক। কিন্তু একজন সংসদ সদস্য বিনা বিচারে একজন মানুষকে মেরে ফেলার দাবি করতে পারে না। এটা করে সুস্পষ্ট তারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তারা যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটাও তো মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য অপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ। সংসদে এসে কোনো কথা বলতে হবে আর কোন কথা বলতে হবে না সেটাই তারা জানেন না।

মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী এলিনা খান বলেন, দেশে নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধের অভাব দীর্ঘদিনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা, মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া এবং বিচারহীনতা এই তিনটির বিশাল একটি ধস নেমেছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। কিন্তু নারীরা আজ ঘরে বাহিরে কোথাও নিরাপদ নয়। দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে গেছে। ধনী-গরিবের মধ্যে বিরাট ফারাক সৃষ্টি হয়েছে। যার প্রমাণ হচ্ছে দেনা শোধ করতে না পেরে বাবা মেয়েকে পাওনাদারের হাতে তুলে দিয়েছে। নৃসংশ বর্বরতা, পাশবিকতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। রাষ্ট্র নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। একারণেই ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে। দেশে আইনের শাসন নেই বললেই চলে। যারা আইন প্রণেতা তারাই সংসদে দাঁড়িয়ে ধর্ষকদের বিচারবর্হিভূত হত্যার দাবি করছেন। এটা দুঃখজনক। এর অর্থ হচ্ছে আমাদের আইন প্রণেতারা দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। বিচার বর্হিভূত হত্যা কোন সমাধান হতে পারে না। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে ধর্ষণসহ সকল অপরাধ কমে আসবে।

জেএসডি’র নিন্দা: বিনা বিচারে ক্রসফায়ারে হত্যা করার দাবি জানিয়ে জাতীয় সংসদে বক্তব্য উত্থাপনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক ছানোয়ার হোসেন তালুকদার। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা বলেন, অপরাধীদের বিচারের আওতায় না এনে বিনা বিচারে হত্যার প্ররোচনায় রাষ্ট্রকে চরম নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাবে। আইন-আদালতকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির শক্তি যোগাবে। সারা বিশ্ব ধর্ষণকারীসহ ভয়ঙ্কর অপরাধীদের যখন আইনের আওতায় এনে কঠোর সাজা নিশ্চিত করছে, তখন বাংলাদেশ থেকে আইনের শাসন বিদায় করার দাবী আত্মপ্রবনতার সামিল। রাষ্ট্রে প্রতিনিয়তই বেআইনি ক্রসফায়ার হচ্ছে কিন্তু অপরাধ ক্রমাগতই বেড়ে যাচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া অপরাধ দমনের আর কোন বিকল্প নেই।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

জাফর আহমেদ

২০২০-০১-১৬ ০০:১৬:২৮

যে ভাবে দেশে শিশু হত্যা শিশু দর্শন হচ্ছে এটার লাগাম টেনে ধরতে হলে এদের হত্যা করা উচিত । এ সব পশুদের এই সমাজে বসবাস করার অধিকার নেই।

নূর মোহাম্মদ নূরু

২০২০-০১-১৫ ২৩:৪৮:১১

আইনের শাসন আইনের শাসন বলে বলে মুখে ফেনা তুললাম সবে। দেশের জন্ম থেকে এ পর্যন্ত প্রকৃত আইনের শাসন এসে ছিল কবে ? মানবাধিকার মানবাধিকার তা কার জন্য বেশি দরকার, ধর্ষকের নাকি ধর্ষিতার ? অপরাধীর নাকি ভুক্তভোগীর ? আমাদের সমাজে ভুক্ত ভোগীর চেয়ে অপরধী কে বাঁচাতেই যেন সচেষ্ট সবাই। একজন ধর্ষিতা ও তার পরিবার সমাজে নিন্দিত মস্তক অবনত সর্ব ক্ষেত্রে। আর ধর্ষকের সিনা টান, পরিবারের সদস্যদের তদ্রূপ । আইনের বিচারের আশায় পার হয়ে যায় বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ , শেষ পর্যন্ত অর্থ ও দাপটের ঠেলায় সু বিচার কয় জন পায়। অর্থ ও দাপটহীনরাই অত্যাচারিত ধর্ষিতা হয় ।

ফারুক হোসেন

২০২০-০১-১৬ ১১:৫৩:৪৩

এনকাউন্টার দিয়ে সমধান করা গেলে দেশে আর আইন আদালত রাখার প্রয়োজন কি?

Kazi

২০২০-০১-১৫ ১২:৪০:১২

না। তবে নীচের আইন বলবত করে দক্ষিণ কোরিয়ায় বছরে ধর্ষণ মাত্র একটি বা দুটিতে নেমে এসেছে। জানি আমার মন্তব্য কেউ আমলে নেবে না। যদিও সংসদে এর চেয়ে কঠিন প্রস্তাব উঠেছে। সব চেয়ে সহজ কার্যকর পদ্ধতি ডাক্তার দিয়ে লিঙ্গ কর্তন করিয়ে ঔষধ লাগিয়ে ছেড়ে দেওয়া । ক্রসফায়ারের চাইতে মানবিক বিবেচনায় ভাল। তৎসঙ্গে শাস্তি প্রাপ্ত ধর্ষক নিজেই জীবন্ত প্রমাণ হিসাবে সমাজে সতর্ক বার্তাবহক হবে। অবিবাহিত হলে বিয়ে করতে পারবে না। বিবাহিত ধর্ষক বউয়ের কাছে যেতেও পারবে । ধর্ষক হিসাবে এর চেয়ে বড় লজ্জাকর কিছুই নাই। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই আইন ও শাস্তি চালু আছে।

আপনার মতামত দিন



প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

এনু-রূপনের বাড়ি থেকে সাড়ে ২৬ কোটি টাকা, ৫ কোটি টাকার এফডিআর, ১ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার

এ যেন বাড়ি নয়, ব্যাংক

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ব্যাংককে দুই অ্যাকাউন্ট

পাপিয়ার ডেরায় যাওয়াদের তালিকা দীর্ঘ

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পাপিয়ার মদতদাতাদের খোঁজা হচ্ছে

আলোচনায় সেলিম প্রধান

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পিবিআই প্রতিবেদন

সালমানের মৃত্যু নেপথ্যে প্রেম

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কি হচ্ছে মালয়েশিয়ায়?

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

করোনা ছড়াচ্ছে দেশে দেশে

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মুজিববর্ষ

সংসদের বিশেষ অধিবেশনে বক্তা প্রণব মুখার্জি

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



পাপিয়ার মদতদাতাদের খোঁজা হচ্ছে

আলোচনায় সেলিম প্রধান

ব্যাংককে দুই অ্যাকাউন্ট

পাপিয়ার ডেরায় যাওয়াদের তালিকা দীর্ঘ

এনু-রূপনের বাড়ি থেকে সাড়ে ২৬ কোটি টাকা, ৫ কোটি টাকার এফডিআর, ১ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার

এ যেন বাড়ি নয়, ব্যাংক