কেন চাপের মুখে অর্থনীতি

স্টাফ রিপোর্টার

প্রথম পাতা ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:১৬

অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী। আমদানি-রপ্তানির সূচকে মন্দাভাব। বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে রাজস্ব আয়ে। বাজেট বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো দেশ মন্দার কবলে পড়ার আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশও এমন পরিস্থিতিতে পড়ছে কিনা এটি এখন দেখার বিষয়।
তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতি এড়াতে এখনই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। যদিও সরকার সংশ্লিষ্টরা বলে আসছেন দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে আছে। প্রবৃদ্ধি আট শতাংশের বেশি হতে যাচ্ছে। সামনে এ গতি আরও বাড়বে। সরকারের এমন প্রত্যাশার বিপরীতে অর্থনীতিতে কেন শঙ্কার মেঘ দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। কেন মন্দার পূর্বাভাস দিচ্ছেন তারা? এসব প্রশ্নের উত্তরে অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সার্বিক অর্থনীতির নীতি-পদক্ষেপ এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী। অর্থনীতির এমন নিম্নগতির মধ্যেও আশা জাগাচ্ছে কেবল প্রবাসী আয়। এ খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বিদেশে কর্মী প্রেরণের হার কোন সুখবর দিতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেবে রপ্তানি আয় কমছে? অক্টোবরে ৩০৭ কোটি ৩২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ কম।

আগস্ট মাসে গত বছরের আগস্টের চেয়ে সাড়ে ১১ শতাংশ আয় কম আর সেপ্টেম্বরে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের চার মাসের গড় হিসেবে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ শতাংশ। গত জুলাই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগস্ট শেষে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৯ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরে এটি দাঁড়ায় ৩৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাইরের মন্দার প্রভাব শুধুমাত্র আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে পড়ছে। বাকি যে সমস্যা সেটা আমাদের নিজেদের সৃষ্টি। তিনি বলেন, ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমে যাওয়া মানে হলো বিনিয়োগ কমছে। উৎপাদন কমছে। ফলে রপ্তানিও কমছে। বিশেষ করে কাঁচামাল আমদানি কমা খারাপ অর্থনীতির লক্ষণ। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণে দুর্নীতি বন্ধ, সুশাসন পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দেশের বাইরে টাকা পাচার রোধ করতে হবে।

অর্থবছরের প্রথম দিকেই সরকারের আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাজেটের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। রাজস্ব আয়ের ধীরগতি, বৈদেশিক ঋণের ছাড় কমে যাওয়া এবং সুদ পরিশোধের চাপে এ অবস্থা বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এবার প্রথম তিন মাসে বাজেট ঘাটতি ৩৭ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। এই সময়ে ওই পরিমাণ অর্থ সরকার ঋণ করেছে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাজেটের জন্য সরকার ১৯ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। সরকার চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এর জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয় করেছে ৪৭ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। এনবিআরের রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ ছিল। প্রথম প্রান্তিকে এনবিআর তার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে আছে। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা আগে নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইদানীং সেখানে ফাটল ধরেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেছে। পরিস্থিতি উত্তরণে বৈদেশিক ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর তাগিদ এই অর্থনীতিবিদের।

অর্থনীতিতে সুখবর শুধু প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে। সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ? অক্টোবর মাসে ১৬৪ কোটি ডলারের রেমিটেন্স এসেছে।

এদিকে সার্বিক অর্থনীতিতে যে চঞ্চলতা নেই তার প্রভাব পড়েছে বাজার ব্যবস্থায়ও। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য, অভ্যন্তরীন বাজারে বিভিন্ন পণ্যের বিক্রি কমেছে। যেসব পণ্যের বিক্রি কমেনি তাদের বিক্রির প্রবৃদ্ধি কমেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক বিভিন্ন খাত ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা পণ্য বিক্রিতে ভাটার টান দেখছে। পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত সিমেন্ট, ইস্পাত, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, নিত্যব্যবহার্য এবং ভোগ্যপণ্য খাতের নেতৃস্থানীয় কোম্পানির সাম্প্রতিক তথ্যে বিক্রি কমার তথ্য উঠে এসেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত সিমেন্ট খাতের ছয়টি কোম্পানির সম্মিলিত বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ১ শতাংশ কম। অথচ গত কয়েক বছর ধরেই সিমেন্ট খাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ইস্পাত খাতেরও একই অবস্থা। এ খাতের চারটি কোম্পানির মোট বিক্রির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম হয়েছে। সার্বিক অর্থনীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ছে। অভ্যন্তরীণভাবে সুশাসনের অভাব, অবকাঠামো দুর্বলতা অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

শুধুমাত্র রেমিটেন্স লাইফ সাপোর্টের মতো কাজ করছে। এছাড়া মূল্য প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে পড়ছি। অবস্থার উন্নয়নে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি বাধা দূরীকরণ, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ণ করতে হবে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

বাহাউদ্দিন বাবলু

২০১৯-১২-০৮ ১৮:৪৯:২৪

আমরা যারা ছোট শহরে বাস করছি তারা বুঝতে পারছি দ্রব্যমূল্যের উধবগতির কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

৫০ ভোটকেন্দ্র নিয়ে শঙ্কা

২০ জানুয়ারি ২০২০

নারীবান্ধব শহর গড়ে তুলবো

২০ জানুয়ারি ২০২০

ভোটের লড়াইয়ে জিততে হবে

২০ জানুয়ারি ২০২০

ভোটাররাই আমার অভিভাবক

২০ জানুয়ারি ২০২০

কূটনীতি

ঢাকায় ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলন প্রস্তুতি এবং...

২০ জানুয়ারি ২০২০

নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়

বুঝতে পারছি না কেন তারা এটা করলো

২০ জানুয়ারি ২০২০

ঢাকা সিটিতে ভোট ১লা ফেব্রুয়ারি

পিছু হটলো নির্বাচন কমিশন

১৯ জানুয়ারি ২০২০





প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত