রাখে আল্লাহ মারে কে!

মানবজমিন ডেস্ক

এক্সক্লুসিভ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:০৩

একেই বলে রাখে আল্লাহ মারে কে! এ বাক্যটি প্রমাণ হয়ে গেছে ভারতের একটি শিশুকন্যার বেঁচে থাকার মধ্যদিয়ে। তাকে তার জন্মদাত্রী মা বা পরিবারের সদস্যরা একটি মাটির পাত্রে করে ৯০ সেন্টিমিটার বা প্রায় তিন ফুট মাটির নিচে জীবন্ত পুঁতে রেখেছিল। পৃথিবীর কারো তার বিষয়ে জানার কথা ছিল না। ওই পাত্রের ভেতর মরে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার কথা ছিল শিশুটির। কিন্তু ওই যে ‘রাখে আল্লাহ মারে কে!’ অন্য এক ব্যক্তির স্ত্রী একটি মৃত কন্যাসন্তান জন্ম দেন। তার পিতা ও অভিভাবকরা তাকে মাটির ভেতর সমাধিস্থ করতে যান। তারা মাটি খুঁড়তেই প্রায় ৯০  সেন্টিমিটার নিচে একটি মাটির পাত্রে কোপ লাগে। তা ভেঙে যাওয়ায়  ভেতর থেকে একটি শিশুর কান্নার শব্দ বেরিয়ে আসে।
সঙ্গে সঙ্গে ওই পাত্রটির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় একটি কন্যাশিশুকে। তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা দেয়ার পর এখন পুরোপুরি সুস্থ ওই শিশু। তাকে চিকিৎসা দেয়া ডাক্তার রবি খান্না এমনটাই জানিয়েছেন।

ওই শিশুটির ওপর সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এ কথা জানিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ভারতের উত্তর প্রদেশের ওই শিশুটিকে মধ্য অক্টোবরে উদ্ধার করে নেয়া হয় হাসপাতালে। তখন তার অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। রক্তে সংক্রমণ ও ভয়াবহ কম মাত্রার প্লেটলেটে ভুগছিল সে। তাকে চিকিৎসা দেয়ার পর এখন ওজন বেড়েছে।

স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। প্লেটলেট এসেছে স্বাভাবিক মাত্রায়। বিবিসিকে এ কথা জানিয়েছেন তাকে চিকিৎসা দেয়া শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রবি খান্না। তবে ওই শিশুটির পিতামাতা কে তা এখনও শনাক্ত করা যায়নি। ফলে বাধ্যবাধকতা আছে এমন একটি সময়সীমা পর্যন্ত অপেক্ষার যার পর তাকে দত্তক দেয়া হতে পারে। বর্তমানে শিশুটি আছে ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশের বেরেলি জেলায় শিশুকল্যাণ বিষয়ক কর্তৃপক্ষের হেফাজতে। শিশুটিকে উদ্ধারের তথ্য নিয়ে এর আগে দৈনিক মানবজমিন সংবাদ প্রকাশ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, উত্তর প্রদেশের এক গ্রামে এক পরিবারে জন্ম নেয় একটি মৃত কন্যাসন্তান। হিন্দুরা সাধারণত মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন চিতায় নিয়ে। কিন্তু শিশু বা অল্প বয়সী বাচ্চাদেরকে তারা মাটিতে সমাহিত করে থাকেন। তাই ওই গ্রামের জন্ম নেয়া মৃত শিশুটির পরিজন পাশের এক ক্ষেতে কোদাল দিয়ে মাটি খনন শুরু করেন। ৯০ সেন্টিমিটার বা তিন ফুট খোঁড়ার পর কোদাল গিয়ে আঘাত করে একটি মাটির পাত্রে। এতে তা ভেঙে যায়। এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি শিশুর কান্নার শব্দ। দ্রুত তার ভেতর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।

কালবিলম্ব না করে তাকে স্থানীয় সরকারি একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় প্রথমে। দু’দিন পরে তাকে স্থানান্তর করা হয় ডাক্তার খান্নার শিশু বিষয়ক হাসপাতালে। সেখানে এই শিশুটি উন্নত সেবা পায়। চিকিৎসকরা বলেন, সে জন্মেছে অপরিণত বয়সে। হয়তো সে তার মায়ের গর্ভে ছিল ৩০ সপ্তাহ। তাকে যখন হাসপাতালে নেয়া হয় সেই সময় তার ওজন ছিল ১.১ কেজি। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল তার দেহ কুঁচকে গেছে। দেহের তাপমাত্রা ছিল খুবই কম। ছিল রক্তে খুব কম মাত্রার চিনি।

গত বৃহস্পতিবার ডাক্তার খান্না বলেছেন, গত মঙ্গলবার শিশুটিকে জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময় তার ওজন বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২.৫৭ কেজি। সে বোতলের খাবার খাচ্ছিল। পুরোপুরি সুস্থ আছে শিশুটি। তবে শিশুটি মাটির নিচে কতদিন ছিল তা পরিষ্কার জানা যায় নি। চিকিৎসকরা আন্দাজ করছেন ওই অবস্থায় শিশুটি কতটা সময় বেঁচে থাকতে পারে। ডাক্তার খান্না বলেছেন, শিশুটিকে হয়তো তিন বা চারদিন আগে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর তার শরীরের ফ্যাট তাকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করেছে। শিশুরা পেটে, উরুতে এবং গণ্ডদেশে প্রচুর ফ্যাট নিয়ে জন্ম নেয়। ফলে এই ফ্যাটের ওপর ভর করে জরুরি সময়ে বেঁচে থাকতে পারে তারা। তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা বলেন অন্য কথা। তারা মনে করেন, শিশুটিকে দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে মাটি চাপা দেয়া হয়। যদি তাকে ওই অবস্থায় উদ্ধার করা না হতো তাহলে হয়তো সে আর এক বা দুই ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারতো। তারা বলেন, যে পাত্রে তাকে মাটিতে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল তার গায়ে ছোট্ট ছোট্ট ছিদ্র থাকতে পারে। এর ভেতর দিয়ে ওই পাত্রের ভেতরে অক্সিজেন প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া মাটির কণার ফাঁক দিয়ে সেখানে অক্সিজেন পৌঁছে যেতে পারে। কারণ, মাটির ওই পাত্রটি খুব বেশি ঘনত্বের কাদামাটি দিয়ে তৈরি নয়। এতে শিশুটির বেঁচে থাকা সম্ভব হয়ে থাকতে পারে।

এ ঘটনায় অক্টোবরে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে পুলিশ। তারা নবজাতকটির পিতামাতার সন্ধান করতে থাকে। তারা মনে করেন, এই শিশুটিকে এভাবে মাটি চাপা দেয়ার সঙ্গে জড়িত তার পিতামাতা। কারণ, এ কাহিনীর ব্যাপক প্রচার হলেও কেউ শিশুটির অভিভাবকত্ব দাবি করে সামনে অগ্রসর হচ্ছে না। সম্ভাব্য মোটিভ নিয়ে কাজ করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ওদিকে ভারতে লিঙ্গগত বৈষম্য বিশ্বে খুবই খারাপ। সেখানে নারীদের সমাজ থেকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। আর মেয়ে শিশুদের দেখা হয় অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে। বিশেষ করে দরিদ্রদের মধ্যে এই সংকট প্রকট। অবৈধ উপায়ে আগে থেকেই অনেক নারী তার গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জেনে যান এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রুণকে হত্যা করেন গর্ভপাতের মতো বেআইনি উপায়ে। এ ছাড়া জন্মের পর মেয়ে শিশুকে মেরে ফেলার বিষয়টি বিরল-এমন নয়।

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

সেই প্রেমের কলেজের অপেক্ষা

২০ জানুয়ারি ২০২০





এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত