এডিসের পর এবার কিউলেক্স

শাকিল আহমেদ/আলতাফ হোসাইন

এক্সক্লুসিভ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৯:৫২

মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী-এটা এখন আর কোন খবর নয়। গোটা রাজধানীজুড়েই এখন মশার কারখানা। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই মশা থাকে সজাগ। আর সাধারণের এসব হয়ে গেছে গাসওয়া। কিন্তু ভয়ঙ্কর তথ্য হলো-এডিস মশার দ্রুত বিস্তার। যার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়ায়। আর ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেককেই মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়। এক সময় সিটি করপোরেশন প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটাতো।
এখন কালে-ভদ্রে চোখে পড়ে। তাও আবার ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করার পর। কিন্তু এডিস মশার উপদ্রব কিছুটা কমতে না কমতেই আক্রমণ শুরু করেছে কিউলেক্স মশা।

সূত্র মতে, জুলাই মাসের মাঝামাঝি রাজধানীতে মশার উপদ্রব্য বেড়ে যায়। দেখা দেয় ডেঙ্গু, ডেঙ্গুর প্রার্দুভাবের ফলে নড়েচরে বসে সিটি র্কপোরেশন। মহামারি আকার ধারন করলে দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন ঢাকার দুই মেয়র।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রনে সিটি কর্পোরেশন যেভাবে কাজ শুরু করেছিল তা এখন অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। যে কারণে নভেম্বরে  কিউলেক্সের উপদ্রব কিছুটা কম থাকলেও এখন তা বেড়েছে।
কিউলেক্স মশা মূলত ডোবা, নালা, ড্রেন, পুকুর ঝিল ইত্যাদী স্থানে বংশ বিস্তার করে। শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ শীতের শুরুতে এ মশার উৎপাত বেড়ে যায়। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মূলত কিউলেক্স মশার মৌসুম। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে  দেখা যায়, ডোবা ও খালগুলো কচুরিপানায় ভরে আছে। ড্রেনগুলোও ঠিক মতো পরিস্কার করা হচ্ছেনা। ফলে সহজেই বংশ বিস্তার করছে কিউলেক্স মশা। এছাড়া সকাল বিকাল ঠিক মত মশার ওষুধ না ছিটানোর কারণে মশার উৎপাত বেড়েই চলছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাসা কিংবা অফিস সব জায়গাতেই মশার উৎপাত। দিনের বেলাতেও মশা কামড়ায় সন্ধার পরে উৎপাত আরো বেড়ে যায়। কোথাও একটু দাড়ানো যায় না। মাঝে মাঝে মশক নিধন কর্মীরা ওষুধ ছিটিয়ে যায়। কিন্তু তাতে মশা মড়ে না। মহাখালির বাসিন্দা নুসরাত জাহান বলেন, এ এলাকায় অনেকদিন মশার ওষুধ ছিটানো হয় না। মশার উৎপাতে ছেলে মেয়েরা সন্ধার পর পড়তে পারেনা। দিনের বেলাও মশায় কামড়ায় নিজেরাই এখন স্প্রে করে নিয়ন্ত্রন করছি।

এবিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মমিনুর রহমান মামুন বলেন, গত মাসের চেয়ে এ মাসে কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করছি। তবে সব অভিযোগ সত্যি নয়। প্রত্যেকটা জোনে আমাদের কর্মীরা মশার ওষুধ ছিটাচ্ছে। তবে হ্যাঁ আমাদের কর্মীদেরও কিছু দোষ ত্রুটি রয়েছে। আনেকেই ভালো ভাবে ওষুধ ছিটাতে স্পটে যায়না কিন্তু ঠিকই তাদের হাজিরা নিয়ে যাচ্ছে। আমারা তাদের মোবাইল ফোন ট্রাকি করছি এরপরও সফল হওয়া যাচ্ছেনা, তবে এরপর থেকে তাদের পাঞ্চ মেিশনের আওতায় নিয়ে আসবো  যাতে কাজে ফাঁকি দিতে না পারে। কোন এলাকায় মশক কর্মী না গেলে আমাদের জানালে আমি লোক পাঠিয়ে দিব। কিউলেক্স মশা  উন্মুক্ত জলাশয়, নালা-ডোবায় বংশ বিস্তার করে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের বাইরেও ওয়াসা রাজউকসহ অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তিমালিকানা ২৩শ বিঘা জমি রয়েছে যা আমাদের পরিস্কার করতে হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের উদ্যোগে এসব পরিস্কার করতো তাহলে আমাদের এত বেগ পেতে হতো না। এমনিতেই আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে। আমরা কাজের পরিধি বাড়িয়েছি আশা করি দ্‌্রুতই এটা নিয়ন্ত্র করা যাবে।

সিটি কর্পোরেশন সূত্রে যানা যায় মশা নিধন কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের  মোট বরাদ্দ ৪৯  কোটি ৩০ লাখ টাকা দক্ষিণ সিটির বরাদ্দ ৪৩  কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় লোক সংখ্যা মোট ৪৬ লাখ ২৪ হাজার ৬২ জন, তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি রয়েছে। ৮২.৬৩৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই এলাকাটিকে পাাঁচটি অঞ্চল বিভক্ত করে ৩৬টি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়েছে। অঞ্চল ১ এ প্রতিদিন কাজ করছে ৪৭জন মশক কর্মী অঞ্চল-২ এ  ৪৫জন  অঞ্চল-৩ এ ৬২ জন অঞ্চল-৪ এ ৪৭জন এবং অঞ্চল-৫ এ ৫৪ জন। হস্তচালিত মেশিন রয়েছে ৮০৪টি,ফগার মেশিন রয়েছে ৬৬০টি, পাওয়ার স্প্রে রয়েছে ২০টি ও মাউন্টিং ফগার মেশিন রয়েছে ২টি।

নগরবাসীদের অভিযোগ, বাজেট বাড়লেও মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের উল্লেখযোগ্য তেমন কোন কার্যক্রম দেখা যায় না। বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা হলেও তা সঠিকভাবে বান্তবায়ন হয় না। ফলে রাজধানী বাসীর পুরোনো এই সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশা কমে গিয়ে এখন নগরে মূলত কিউলেক্স মশার উপদ্রব চলছে। স্ত্রী কিউলেক্স মশার মাধ্যমে অসুস্থ ব্যক্তির শরীর থেকে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে ফাইলেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে। এতে গোদ নামে পরিচিত একটি রোগ হতে পারে। এ রোগের প্রভাবে হাত পা ফুলে যায় ও বারবার জ্বর হয়।

হাজারীবাগের বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, সন্ধ্যা হলেই শুরু হয় মশার উৎপাত। কয়েল জ্বালিয়েও মশা থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। ডেঙ্গুর সময় ওষুধ ছেটাতে দেখা গেলেও বর্তমানে সিটি করপোরেশনের কোন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। শীত শুরু না হতেই যেভাবে মশার উৎপাত শুরু হয়েছে, তাতে এখনই কোন ব্যবস্থা না নিলে শহরে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

কলাবাগানের বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পর মশক নিধন কার্যক্রম চলে কদিন। কিন্তু এখন তেমন চোখে পড়ছে না। আর যে ওষুধ দেয়া হয় তাতে মশা নিধন হয় কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ হয়। যদি ওষুধে কাজ হতো তবে এতো ওষুধ দেয়ার পড়েও মশাতো কমে নাই। লোক দেখানো ওষুধ দিলে হবে না, কার্যকর ওষুধ দিতে হবে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশা নিধন কার্যক্রমের ১৮-১৯ ওয়ার্ডের সুপারভাইজার এসএম মনিরুল ইসলাম জানান, আমরা গত রোববার থেকে মশা নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছি। আজ ধানমন্ডির ১৯ এ আছি। এভাবে আরও দুইদিন আমাদের কার্যক্রম চলবে। তিনি বলেন, ফগার মেশিন দিয়ে আমরা মশার লাভাগুলো ধ্বংশ করছি। কিন্তু যেসব মশা উড়ে চলে যাচ্ছে সেগুলোতো আমরা মারতে পারবো না। এলাকাবাসীর অভিযোগও ঠিক আছে। এই মশাগুলো উড়ে বাসা বাড়িতে চলে যাচ্ছে। তাই তারা বলছেন মশার উপদ্রব বেড়েছে। কিন্তু আমরা যে লাভা ধ্বংস করছি এতে মশার বংশ বিস্তার কমে যাবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল আউয়াল বলেন, মশার উপদ্রব আগের চেয়ে বেড়েছে। ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত নালা পরিষ্কার করে না। ময়লা নালা থেকে মশা বংশ বিস্তার করে। তবে মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

কিউলেক্স মশার উপদ্রব সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহমেদ বলেন, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে আমাদের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে প্রতিদিন পাঁচটি করে ওয়ার্ডে জরিপ চালানো হয়েছে। জরিপকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। গত ১লা ডিসেম্বর আমাদের একটি প্রোগ্রাম হয়েছে। এভাবে দফায় দফায় আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। জরিপকারী কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিউলেক্স মশা নিধনের জন্য। বর্তমানে আমাদের সাধ্য অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, এ ছাড়া আমাদের আরও কিছু পরিকল্পনা আছে। বিদেশ থেকে একটি আধুনিক মেশিন আনার পরিকল্পনা চলছে। যার লম্বা একটি পাইপ রয়েছে। এই মেশিন দিয়ে সহজে মশা নিধন করা যায়। এটা নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম সম্প্রতি বলেছেন, কোন কোন এলাকায় কিউলেক্স মশার প্রকোপ বেশি, তা কীটতত্ত্ববিদের মাধ্যমে জরিপ করে চিহ্নিত করেছেন। যেসব এলাকায় কিউলেক্স মশা তুলনামূলক বেশি, সেই ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সাধারণত শীতকালে কিউলেক্স মশার প্রকোপ বাড়ে। তাই পুরোপুরি শীত পড়ার আগেই যেকোনো মূল্যে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে। তিনি আরও বলেন, কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শে মশক নিধনে এরই মধ্যে আমরা বেশকিছু আধুনিক (চতুর্থ প্রজন্মের) যন্ত্রপাতি ক্রয় করেছি। আমরা ২০টি মিক্সড ব্লোয়ার যন্ত্র এনেছি। যার সাহায্যে কাভার্ড ড্রেনগুলোর ভিতরে মশার ডিম ও লার্ভা নিধনে কীটনাশক (লার্ভিসাইড) সহজে কার্যকরভাবে স্প্রে করা যাবে। এছাড়া অল্প সময়ে অধিক এলাকায় পূর্ণাঙ্গ মশা মারার কীটনাশক (এডালটিসাইড) ছিটানোর জন্য দুটি ভেহিকেল মাউন্টেড ফগার মেশিন আমদানি করা হয়েছে। আরো তিনটি আমদানি করা হবে। এর ফলে মশক নিধন কার্যক্রমে ডিএনসিসির গতি বৃদ্ধি পাবে বলে জানান মেয়র।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার জানান, কিউলেক্স মশার প্রাদুর্ভাব সাধারণত প্রতি বছরের নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত থাকে। বর্তমানে দুই সিটিতে যেসব মশা দেখা যায় এর ৮০ থেকে ৯০ ভাগই কিউলেক্স মশা। এই মশার কামড়ের ফলে গোদ রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে গোদ ছড়ানোর আশঙ্কা কম। কারণ কিউলেক্স মশা প্রায় ১০ হাজার বার কামড়ালে এই রোগ হয়। এর সঙ্গে রোগীকে কৃমি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই মশার প্রাদুর্ভাব কমানোর বিষয়ে তিনি জানান, এটি দমনে লার্ভি সাইড লিকুয়েড ছিটাতে হবে। যার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

সেই প্রেমের কলেজের অপেক্ষা

২০ জানুয়ারি ২০২০





এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত