বাবরি মসজিদ রায়: একেই কি বিচার বলে?

বিশ্বজমিন

সৈয়দা হামিদ | ১০ নভেম্বর ২০১৯, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২৭
মনে হয় এইতো কালকের ঘটনা। জামিয়ায় আমার ঘর থেকে দেখলাম মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলা হলো। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেখলেন রেস কোর্সের ৭ নম্বর বাসা থেকে। ২৭ বছর পর অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের ৫ বিচারপতির সর্বসম্মত রায়ে অবসান হলো এই অধ্যায়ের।
রায় অনুযায়ী ভারতীয় ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি ৩ মাসের মধ্যেই বুঝে পাবে সরকারের তৈরি করে দেওয়া একটি ট্রাস্ট। অয্যোধ্যায় অন্য কোথাও ৫ একর পাবে মুসলিমরা। এটাই কি বিচার? আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখলাম, আদালত বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে অবৈধ বলে বর্ণনা দিয়েছেন। সম্মানিত বিচারকদের কাছে আমার ছোট একটি প্রশ্ন: যদি মসজিদ ভাঙ্গা অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে ২.৭৭ একর জমি কেন সেই পক্ষকেই উপহার দেওয়া হলো যারা এই অবৈধ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল? এই প্রশ্নের পর আরও কিছু চিন্তা মাথায় আসলো।
এই মামলায় হিন্দু পক্ষ ছিল দু’টি। একটি নির্মোহি আখাড়া ও রাম লালা ভিরাজমান।
এরপর রাম জন্মভূমি ন্যাস নামে আরেক পক্ষ অন্তর্ভুক্ত হলো। এই তৃতীয় পক্ষই এখন বিজয়ী হলো। এটি এখন ট্রাস্টে আধিপত্য ফলাবে? কিংবা ভারত ও বিশ্বজুড়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য আদায় করা বিপুল অর্থও কি তারা পাবে?
ভারতের প্রতœতত্ব বিভাগের প্রধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, মসজিদের নিচে কোনো মন্দির ছিল না। এই প্রতিবেদনের শেষে একটি অংশ ছিল যেখানে কেউ স্বাক্ষর করেনি। এতে বলা হয়, মাটির নিচে যে কাঠামো পাওয়া গেছে, তা ইসলামি ঘরানার নয়। আদালত কি তাহলে স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনের বদলে অস্বাক্ষরিত অংশবিশেষকে আমলে নিয়েছে?
এই রায় কীভাবে প্রতিভাত হবে তা কি ভেবে দেখা হয়েছে? এমনটা কি মনে হচ্ছে না যে, সংখ্যাগুরুকে তুষ্ট করতে সংখ্যাগুরুর ধ্যানধারণার প্রভাবে একটি সংখ্যাগুরুকেন্দ্রিক রায় দেওয়া হলো? এর মাধ্যমে কি একটি নজির সৃষ্টি হয়ে গেলো না? আমাদের ইতিহাস প্রাচীন। কালে কালে পুরোনো শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন শহর। এক দিল্লি শহরই ৭ বার ধ্বংস হয়েছে, আবার গড়ে উঠেছে। কাশী? মাথুরা? আরও কত হাজার হাজার ধর্মীয় স্থাপনা আছে এই ভাংচুরের তালিকায়?
এই রায় থেকে কি মুসলমানদের স্বস্তি পাওয়া উচিৎ? নাকি উল্টোটা? এমনটা কি বলা যায় না যে, আদালত যে কাজকে অবৈধ বলে বর্ণনা করেছে, সেই অবৈধ কাজ যারা করেছে তারাই যা চেয়েছে তা পেল?
মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে উদ্ধৃত করে বলতে হয়, যা হওয়ার ছিল, তা হয়ে গেছে। এখন মুসলিম হিসেবে নিজেকে আমি আল্লামা ইকবালের ভাষায় প্রশ্ন করতে চাই: আমাদের এখন কী করা উচিৎ? আমাদের এখন কী করা উচিৎ নয়?
দেশজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা আনা হয়েছে। অনেকটা যেন এমন যে, মুসলিমরা দেশের প্রত্যেক গলি আর মহল্লা থেকে বিক্ষোভ নিয়ে বের হবে। কিংবা হিন্দুরা সব জায়গা থেকে আনন্দ মিছিল নিয়ে বের হবে। এমনটা হওয়ার কথা নয়। ঘটা উচিতও নয়। আমি হিন্দুদের কথা বলতে পারি না, তবে মুসলিমদের কথা বলতে পারি। আমি আমার সহ-ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই, কোনো এজেন্সি নেই, বিক্ষোভের কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। যারা এই ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতিবাদ করতে চায় তাদের জন্য সমস্ত কিছু মিইয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। আমি চাই না রাজপথে নির্দোষদের প্রাণহানি হোক, রক্ত ঝরুক। কারণ, হতদরিদ্রদেরই ক্ষমতাধররা ব্যবহার করে সহিংসতা আর বিভাজনের জন্য।
মুসলিমদের জন্য এখন কেবল একটিই রক্ষাকবচ আছে, যা তারা পেয়েছে পবিত্র কোরআন ও নবী (স.)-এর কাছ থেকে। তাদের উচিৎ স্পষ্ট, দ্বিধাহীন কিন্তু ভদ্রভাবে অয্যোধ্যায় ৫ একর জমির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা। এরপর ক্ষমতার লোকদের বলা উচিৎ: ‘আপনারা যেহেতু ঐক্যমতের ভিত্তিতে এই রায় দিয়েছেন যে, মসজিদ ভাঙ্গা ও মূর্তি রাখার কাজ অবৈধ ছিল, সুতরাং আমাদের বিকল্প একখ- জমি দেবেন না। আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। আপনাদের রায়ের আলোকে আমাদের শুধু একটি নিশ্চয়তা দিন যে, এমনটা আর কখনই হবে না।’

(সৈয়দা হামিদ একজন লেখিকা ও মুসলিম ওমেনস ফোরামের প্রেসিডেন্ট। তার এই নিবন্ধ ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস থেকে নেওয়া হয়েছে।)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

azad

২০১৯-১১-১৪ ১৮:২১:০৪

Amar moner kothati boleche, 5 akor jomi muslimder neya uschit na.

Abdul hai mazumder

২০১৯-১১-১১ ০২:০৫:৫০

ঠিক বলছেন।আপনাকে ধননবাদ।

তাওহীদুল ইসলাম

২০১৯-১১-১০ ২৩:১১:৪০

পৃথিবীন সর্বাধিক সাম্প্রদায়িক দেশ ভারতের সৈরাচারি সরকারের কাছে অন্ধ পক্ষপাতিত্ব রায় ছাড়া আর কি বা ভাবা যায়। ধিক শত ধিক বিচারকের আসনে বসেও সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠতে পারলে না।

MMM

২০১৯-১১-১০ ২১:২৯:২৮

Indian shows their democracy. Whatever it is Islam is the symbol of piece we proved again.

জাফর আহমেদ

২০১৯-১১-১০ ১২:৫১:০১

ভারত একটি হিন্দু উগ্র সাম্প্রদায়িক দেশ । তার উপর উগ্র সরকার, তারা তাদের মতো করে রায়ের ব্যবস্থা করেছে। আর মুসলিমদের জুতা নিক্ষেপের পর গরু দান করল। এখন ভারতের মুসলিমদের ঐ রকম দান খয়রাত থেকে দূরে থাকতে হবে।

মোঃ আবুল মনসুর খান

২০১৯-১১-১০ ১০:৩৫:১৩

চমৎকার তথ্যনির্ভর ও যুক্তিযুক্ত লেখা। আরব ভূমিতেই আজ মুসলমানদের নিরাপত্তা নেই। আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে এবং চাওয়ার মত চাইতে হবে।

Dr haidar

২০১৯-১১-১০ ০৮:৩১:৪৭

উগ্রবাদী হিন্দুদের এ বিজয়ের পর মুসলমানদের কে কি তাহলে ঐতিহাসিক আরো স্থাপনা এভাবে বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে? বিশেষ করে এখনকার মত উগ্র সাম্প্রদায়িক দল ক্ষমতায় থাকলে আরো অনেকে দুঃসংবাদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ধিক বিচারক দের এমন অনৈতিক রায়ের জনৃ।

Shahadus jaman

২০১৯-১১-১০ ০৭:২৭:৩৩

ভারতের প্রতœতত্ব বিভাগের প্রধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, মসজিদের নিচে কোনো মন্দির ছিল না। এই প্রতিবেদনের শেষে একটি অংশ ছিল যেখানে কেউ স্বাক্ষর করেনি। এতে বলা হয়, মাটির নিচে যে কাঠামো পাওয়া গেছে, তা ইসলামি ঘরানার নয়। আদালত কি তাহলে স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনের বদলে অস্বাক্ষরিত অংশবিশেষকে আমলে নিয়েছে? এই রায় কীভাবে প্রতিভাত হবে তা কি ভেবে দেখা হয়েছে? এমনটা কি মনে হচ্ছে না যে, সংখ্যাগুরুকে তুষ্ট করতে সংখ্যাগুরুর ধ্যানধারণার প্রভাবে একটি সংখ্যাগুরুকেন্দ্রিক রায় দেওয়া হলো? এর মাধ্যমে কি একটি নজির সৃষ্টি হয়ে গেলো না? আমাদের ইতিহাস প্রাচীন। কালে কালে পুরোনো শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন শহর। এক দিল্লি শহরই ৭ বার ধ্বংস হয়েছে, আবার গড়ে উঠেছে। কাশী? মাথুরা? আরও কত হাজার হাজার ধর্মীয় স্থাপনা আছে এই ভাংচুরের তালিকায়?

মাসুম

২০১৯-১১-১০ ০৭:০০:১২

বিচারপতিরা তাদের ধর্ম বিশ্বোসের প্রতি পরিপুর্ন আস্থার কাজটিই করেছেন । ভারতের মুসলমানরা নিগৃহিত , বৈষম্যের শিকার , সুবিচার বন্চিত সেটা আবার প্রমান করলো ভারতের সুপ্রিম কোর্ট । এই রায় বাবরী মসজিদ ভাঙার অপরাধটিকে বৈধতা দিয়েছে ।

নূর মোহাম্মদ

২০১৯-১১-১০ ০৬:০৬:৪৬

ঐ ভিক্ষার জমি কোন অবস্থায়ই নেয়া উচিত হবে না। ওত গরু মেরে জুতা দানের মতো।

নূর মোহাম্মদ

২০১৯-১১-১০ ০৬:০৬:৪৪

ঐ ভিক্ষার জমি কোন অবস্থায়ই নেয়া উচিত হবে না। ওত গরু মেরে জুতা দানের মতো।

Md. Harun al Rashid

২০১৯-১১-১০ ০৬:০৬:০৪

A bright example of bulldozing the holy place of other religion was established through this controversial verdict and the fanatic hindu miscreants shall be inspired to destroy more mosques in India.

NAZMUL ISLAM

২০১৯-১১-১০ ১৬:৪৮:০১

এই সুন্দর প্রতিবেদন করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। প্রকৃত পক্ষে ইসলামই শান্তি ও সত্যর ধর্ম বার বার প্রমানিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কোন মুসলিম দেশে এই ধরনের জঘন্য কাজ অতিতে কখনও হয় নাই এবং হবেও না। ধিক্কার জানাই এই রায়কে। ঘৃণ্য করি ঐ আদালতকে এবং বিচারককে।

আপনার মতামত দিন

যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে তুরস্ক ও গ্রিস!

‘পুরস্কার নিয়ে আফসোস নেই আমার’

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডাকাতদের গোলাগুলি, নিহত ১

সমন্বয়হীনতা ও পর্যবেক্ষণের অভাবে বাজারে এমন অবস্থা

মাবিয়ার ইতিহাসের দিনে তিন স্বর্ণ বাংলাদেশের

বন্ধু সৈকত গ্রেপ্তার

তিন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ে গুরুত্বারোপ

ওবায়দুল কাদেরের বিকল্প কে?

দীর্ঘ হচ্ছে দুদকের অনুসন্ধান তালিকা বেশির ভাগই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী

রাজধানীর পৃথকস্থানে দু’টি বাসে আগুন

বঙ্গবন্ধুকে ‘ডক্টর অব ল’ সম্মাননা দেবে ঢাবি

জটিলতায় আটকে আছে ২ লক্ষাধিক ড্রাইভিং লাইসেন্স

‘আওয়ামী লীগ আমার আবেগ আমার অস্তিত্ব’

সভাপতি এমএ সালাম সম্পাদক আতাউর

রোহিঙ্গাদের অধিকার বিষয়ক অফিস বন্ধের নির্দেশ বাংলাদেশের

সমাধান খুঁজছে সিলেট বিএনপি