বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি

ফের আলোচনায় আবদুল হাই বাচ্চু

প্রথম পাতা

মারুফ কিবরিয়া | ১৭ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:২৩
বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। চার বছর কেটে গেলেও শেষ হয়নি তদন্ত। সে সঙ্গে এ নিয়ে রহস্যের জট যেন কিছুতেই খুলছে না। রহস্যের বেড়াজালে রয়েছে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো ‘অ্যাকশনে’ না যাওয়ার বিষয়টিও। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক সংস্থা টাকা লুটপাটের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা জানালেও দুদক এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পায়নি বলে দাবি করছে। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের এমপি ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে দুদকের ‘ব্যর্থতার’ কথা উল্লেখ করেন। ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের পদত্যাগ করা উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এসব নিয়ে চলতি সপ্তাহে দীর্ঘদিন ধরে চলা আবদুল হাই বাচ্চু’র ইস্যুটি আবারো আলোচনায় উঠে আসে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দুদকের চেয়ারম্যানের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত। আমরা বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাতে দেখেছি, তদন্ত করে দেখেছি, বেসিক ব্যাংকের মাধ্যমে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেটার মূল ব্যক্তি হলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। যার কারণে সরকার তাকে সেই পদ থেকে অপসারণ করেছে। কিন্তু আজ অবধি বেসিক ব্যাংক সংক্রান্ত যতগুলো দুর্নীতির মামলা হয়েছে, আমরা লক্ষ্য করেছি, শুধু কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির মামলা হয়নি। শুধুমাত্র কয়েক দফা তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের এই সাবেক চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততা থাকার পরও তাকে কেন আসামি করা হচ্ছে না সে বিষয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছে দুদক। সংস্থাটির সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখ্‌ত জানিয়েছেন, আব্দুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তাকে এ ঘটনায় আসামি করা হয়নি। তিনি বলেন, অর্থের উৎস, অর্থ কোন জায়গায় ব্যবহার হয়েছে, কোথায় সম্পদ হিসেবে কনভার্ট হয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি শেষে যাকে আইনের আওতায় আনার তথ্য উপাত্ত পাওয়া যাবে তাকেই চার্জশিটভুক্ত করা হবে। দুদক সচিব বলেন, এ টাকাটা যখন চেকে নিয়েছে, উত্তোলন করার পরে টাকা যদি ব্যাংকে রাখা হতো তাহলে উৎস পাওয়া যেত। টাকা নিয়ে একেকজন একেক কাজে ব্যবহার করেছে। সেখানে মানিলন্ডারিং হয়েছে। কাজেই অর্থের উৎস খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় বিলম্ব হয়ে থাকে। আপনারা যে মামলার কথা বলেছেন, সেগুলো জটিল প্রকৃতির মামলা। সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার মধ্যে বেশিরভাগ টাকাই নগদে উত্তোলন হয়েছে। এ টাকা কোথায় ব্যবহার কিংবা জমা হয়েছে আমাদের কর্মকর্তারা বের করতে পারেনি। তদন্ত কর্মকর্তারা টাকার লিঙ্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত টাকা কোথায় গেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে বের করা সম্ভব না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

ওদিকে এত এত আলোচনার পরও শেখ আবদুল হাই বাচ্চু দুদকের মামলার আওতামুক্ত থাকার পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যাবে না। তবে বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতির ঘটনায় তার (শেখ আবদুল হাই বাচ্চু) বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে তাহলে সেটা দুদক আমলে না নিতে পারার পেছনে অদৃশ্য শক্তি থাকতে পারে। এখানে দুদকের দক্ষতার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। দুদক সচিবের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কেন পাচ্ছে না সে বিষয়ে দুদককে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এজন্য আরো গভীর তদন্তের প্রয়োজন বলেও মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।  

বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অধিকাংশ প্রতিবেদনে আবদুল হাইয়ের সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসে। এমনকি  অর্থমন্ত্রী বেসিক ব্যাংকে লোপাটের পেছনে আবদুল হাই বাচ্চু জড়িত বলে উল্লেখ করেন। জাতীয় সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সংসদীয় কমিটিতেও এ জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন কমিটির সদস্যরা। অথচ এই ঘটনায় দায়ের করা কোনো মামলাতেই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। অনুসন্ধানকালে তাকে কখনো দুদকে ডাকাই হয়নি। আদালতের একটি আদেশের পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তাকে প্রথমবারের মতো তলব করে দুদক। এ পর্যন্ত পাঁচবার দুদক কার্যালয়ে পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল জিজ্ঞাসাবাদ করে বাচ্চুকে।

সূত্র জানায়, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর দুই মেয়াদে দুর্নীতির সব আলামত, দলিল, কাগজপত্র দুদকের হাতে আছে। সে সময়ের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও অর্থ আত্মসাতে যোগসাজশ থাকা ব্যাংকের গুলশানসহ কয়েকটি শাখার দুর্নীতি-সংক্রান্ত সব নথিও রয়েছে তদন্ত কর্মকর্তাদের ফাইলে। এরপরও তদন্তের কোনো কূল কিনারা হয়নি। বর্তমানে দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার তদন্ত করছে। দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, বেসিক ব্যাংকের কেলেঙ্কারির ঘটনায় মামলার তদন্তটি কোন পর্যায়ে রয়েছে সেটা বলা মুশকিল। তবে এটা ঠিক যে দীর্ঘ সময় কেটে গেছে কোনো সুরাহা হয়নি।

দুদক ২০১৫ সালের ২১-২৩শে সেপ্টেম্বর বেসিক ব্যাংকের ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৬টি মামলা করে।  ২০১৭ সালের শেষ দিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাচ্চুসহ তৎকালীন পর্ষদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত ও আদালতে চার্জশিট পেশের জন্য দুদকের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্ত শেষ না হওয়ায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের ওই আদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। জালিয়াতি করে বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদকে পাঠানো হয় ২০১৩ সালে। পরে অভিযোগটি অনুসন্ধান করে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ৫৬টি মামলা করে ২০১৫ সালের ২১-২৩শে সেপ্টেম্বর। ৫৬ মামলায় ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়। বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৯ টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান করে আর কোনো মামলা করা হয়নি। ওই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার সময় দুই মেয়াদে শেখ আবদুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকলেও তাকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। শুধু তাই নয়, ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের কারও নাম আসামির তালিকায় নেই। ওই ৫৬ মামলার বিপরীতে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা ঋণ প্রস্তাব ছিল জালিয়াতিপূর্ণ। অ্যাকাউন্ট খোলার আগেই টাকা হাতে পেয়েছেন লুণ্ঠনকারীরা, যা ছিল নজিরবিহীন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকায়। ওই ৪ বছর ৩ মাসে ব্যাংকটি ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়, যার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়েছে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত কুমিল্লার

সান্ধ্য কোর্স বন্ধসহ ১৩ নির্দেশনা ইউজিসি’র

ইমরুল-ওয়ালটন ঝড়ে চট্টগ্রামের জয়

খালেদা জিয়ার মেডিকেল রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টে

চবিতে শিবির সন্দেহে শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের মারধর

হবিগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাহির-আলমগীর

‘জয়বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করায় আ স ম রবের অভিনন্দন

ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে পদস্খলন হলে ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থান দুর্বল হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

‘সেনাদের অপরাধ আন্তর্জাতিকীকরণের সুযোগ নেই, গণহত্যা সনদ প্রযোজ্য নয়’ (ভিডিও)

জীবন নিয়ে ‘শঙ্কিত’ ইলিয়াস কাঞ্চন

মুম্বইয়ে মার্কেট থেকে পিয়াজ চুরি (ভিডিও)

বিশ্বজুড়ে আড়াইশ সাংবাদিক জেলে, শীর্ষে চীন

চলন্ত বাস থেকে পড়ে মা-ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যু

‘ভিন্নমতের কারণে ১০ বছরে ৩৫ লাখ আসামী, নিহত ১৫২৫, গুম ৭৮১’

সেনাদের পক্ষ নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন সুচি

শায়েস্তাগঞ্জে ট্রেনের ঝাপ দিয়ে যুবকের আত্মহত্যা