বেকারত্ব উদ্বেগজনক সমস্যা দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

মত-মতান্তর

নাজমুল হোসেন | ১০ মার্চ ২০১৯, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:২৬
বেকারত্ব একটি সামাজিক ব্যাধি অথবা সংকট। দিনদিন বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছেই। মাত্র সাত বছরে এই হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। ধরন অনুসারে বেকারত্বকে বেশ কয়েকটি শ্রেণিবিভাগ করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে স্থায়ী বেকারত্ব, অস্থায়ী বেকারত্ব, সাময়িক বেকারত্ব, মৌসুমি বেকারত্ব ইত্যাদির কথা বলা যায়। যে ধরনের বেকারত্বই হোক, এই পরিস্থিতি ব্যক্তি তো বটেই, পরিবার, দেশ, জাতির জন্য একটি ভয়াবহ সমস্যা। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ যদিও সামপ্রতিককালে সেটি উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অবস্থান নিয়েছে।
কোনো দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কাজে না লাগালে অর্জিত সেই উন্নয়নশীল নামক তকমার সার্থকতা ক্ষীণই থেকে যাবে। স্বাধীনতার পর থেকে গত দশকে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, বেশ কয়েকটি সূচকেও উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু বেকারত্ব দূরীকরণে তেমন অগ্রগতি না থাকায় সেটি উদ্বেগজনক হারে দিন দিন বাড়ছে।

সমপ্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গত বছর প্রকাশিত বিবিএস’র (২০১৬-২০১৭) জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা চার কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার। বেকারত্বের কারণে ৭৮ লাখ বাংলাদেশি বর্তমানে বিদেশে কর্মরত আর এই সংখ্যার পরিমাণ বর্তমানে আরো বেড়েছে।

একটি সংস্থার তথ্যানুযায়ী দেশে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে শতকরা ৪৭ ভাগ বেকার। আর এমন বেকারত্বের দেশে তিন লাখ বিদেশি নাগরিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছেন। প্রতি বছর প্রায় তারা ৪০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ থেকে। এক দিকে বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিদেশে কঠোর শ্রম আর ঘাম ঝরিয়ে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। অপর দিকে তাদের পাঠানো প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ পরিমাণ টাকা প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন এখানে কর্মরত বিদেশিরা। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল এবং বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত দেশে এ বিপরীত চিত্র মেনে নেয়ার মতো নয়। গার্মেন্ট, টেক্সটাইল ও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কয়েক লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কর্মরত।

তাদের মাধ্যমেই ভারত বাংলাদেশ থেকে এ বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্জন করছে প্রতি বছর। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের কর্মক্ষেত্রে বাড়ছে বিদেশি কর্মকর্তার সংখ্যা। কারণ একটাই, নিয়োগকারীরা দক্ষ জনশক্তি দেশে পাচ্ছেন না।  ভারতীয়সহ বিদেশিরা কর্মরত থাকলেও এ অবস্থা থেকে উত্তরণ তথা দক্ষ জনবল গড়ে তোলার বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া উচ্চশিক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয়হীনতা ও শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি কয়েক বছর ধরে বহুল আলোচিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বেকারত্বের মূল কারণ জনসংখ্যা বাড়ার অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়া। তবে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় বাড়ছে এই সংখ্যা। বিনিয়োগের অভাব, আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়া, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি না ঘটা, রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয় বিকাশ না ঘটা, দক্ষ ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অভাব, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কায়িক শ্রমে অনীহা, সীমাহীন দুর্নীতিসহ নানা কারণেই বাড়ছে বেকারত্বের হার। বেকারত্বের কারণে শিক্ষিত যুবকরা নানা রকম আইনবিরোধী অপরাধ কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া দেশের নানা প্রান্তে অহরহই ঘটছে আত্মহত্যার মতো ঘটনা।

বেশির ভাগ শিক্ষিত যুবক-যুবতী সঠিক সময়ে বিয়ে করতে পারছে না। ভেঙ্গে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের গড়ে উঠা প্রেমের সম্পর্ক। আর এই হতাশার সুযোগে বেকারত্ব নামক ঘাতক অবলীলায় কেড়ে নিচ্ছে এই সব সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ। দেশে চাকরির ক্ষেত্র একেবারেই কম তা বলা যাবে না তবে প্রয়োজনের তুলনায় হয়ত পর্যাপ্ত নয়। সরকারি ও বেসরকারি উভয় সেক্টরেই এখনও যে পরিমাণ পদ খালি রয়েছে তা পূরণ করতে পারলে দ্রুতই বেকারত্ব সমস্যা মোটামুটি একটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসতে পারে। কারণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী শুধুমাত্র সরকারি ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আওতাধীন দপ্তরে এখনও ৩,৩৬,৭৪৬টি পদ খালি রয়েছে। আর শিল্পায়নের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দিন দিন অসংখ্য মিল, ফ্যাক্টরি, ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে। এখানেও সৃষ্ট অসংখ্য পদের বিপরীতে অনেক দক্ষ লোকের দরকার। অথচ আমাদের দেশে নেই একটি গ্রহণযোগ্য নিয়োগ বিধি। বেকারত্বের আরো একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের সীমা ৩০ বছর পর্যন্ত থাকা। উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিটি অর্জন করার পরই হাতে থাকা ২/৩ বছর চাকরি পেতে পেতে বা চাকরির প্রস্তুতি নিতে নিতে সেই সময় দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফলে তারা না অর্জন করতে পারে অভিজ্ঞতা, না পায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ। তাই এই সব সমস্যা দূর করতে চাকরিতে প্রবেশের সীমা না থাকাটাই যৌক্তিক বলে মনে করি।

বিশ্বের অন্য কোনো দেশের নিয়োগ বিধিতে এমন আজগুবি ও অযৌক্তিক নিয়মনীতি আছে বলে জানা যায় নি। আর এসব কারণই এদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির পূর্বশর্ত। তবে সরকারের পুরনো প্রতিশ্রুতি রক্ষাকরণ স্বরূপ প্রতিটা পরিবারে যোগ্যতানুযায়ী কমপক্ষে একজনকে চাকরি দিলে হয়ত অনেক পরিবার উপকৃত হতো। একটি বিশাল জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরিত না করতে পারার দায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকার এড়াতে পারে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ৬০ ভাগও কর্মমুখী নয়। কাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই বেকারত্ব দূরীকরণের অনুকূলে নয়। প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না।

দেশে শিক্ষা ও কর্ম এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে বিরাট ফারাক। যেমন আমাদের রয়েছে বিশাল গার্মেন্ট শিল্প কিন্তু সে অনুপাতে নেই টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়। গতানুগতিক শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত হয়ে আমাদের তরুণরা যেখানে মাত্র ১০০০০ টাকায় চাকরিতে যোগদান করে আর তার বিপরীতে একজন মূর্খ রিকশাচালক কমপক্ষে মাসে ১৫০০০ টাকা রোজগার করতে পারছে। এই প্রভাবে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে দিনদিন যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে তা ভাবার বিষয় নয় কি? সেই সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের বড় খাতগুলো যেমন পোশাক, চামড়া, ওষুধ শিল্প ইত্যাদি বিষয়েও শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে শিক্ষা ব্যবস্থা ভয়াবহ রকম পিছিয়ে রয়েছে। বেসরকারি খাতে বর্তমানে বিশেষজ্ঞ, কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিতদের চাহিদা বেশি। যে কারণে প্রচলিত ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের বেসরকারি খাতে চাকরি পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। আর অল্প কিছু কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তা কতটা সমসাময়িক, সে প্রশ্ন তো আছেই। বেকারত্বের এই লাগামহীন ঘোড়াকে এখনই টেনে ধরতে না পারলে যেকোনো সময় বেকারত্বের বিস্ফোরণের ফলে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। আর এতে করে জাতি ও সরকার চরম সমস্যার সম্মুখীন হবে।

তবে বেকারত্ব সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। অন্তত সহনীয় পর্যায়ে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে না কর্মসংস্থানের সুযোগ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা পরিকল্পিত পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মের উপযুক্ত করে ঢেলে সাজানো, নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূলধনের অভাব দূর করাসহ নিতে হবে নানাবিধ সমন্বিত উদ্যোগ।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট
ই-মেইল: nazmulhussen@yahoo.com

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

এয়ার শো’তে অংশ নিতে আমিরাত যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী

টেস্ট ম্যাচ দেখতে প্রধানমন্ত্রীকে মোদির আমন্ত্রণ

ঢাকায় আসছেন ড. কলিন ফিপস ডিওং

ভারতীয় স্বার্থ রক্ষায় ৬৫ দেশে সক্রিয় ২৬৫টি ভুয়া ওয়েবসাইট

রোববার শুরু হচ্ছে প্রাথমিক-ইবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষা

মশাকাণ্ড, স্ত্রীর হামলায় স্বামী হাসপাতালে, মামলা

ভারতের বিরুদ্ধে লড়তে কাশ্মীরিদের প্রশিক্ষণ দিতাম: পারভেজ মোশাররফ

জয়ের পথে বাংলাদেশ ইমার্জিং দল

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় জামিন চেয়ে খালেদার আপিল

পিতাকে হত্যার দায়ে ছেলের যাবজ্জীবন

এরদোগানের বিরোধিতা মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের

শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শনিবার, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দু’জন

‘ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের তামাশার মত করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়’

কোন ডকুমেন্ট পোড়েনি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগে সুচির বিরুদ্ধে মামলা

৬৯ বারের মতো পেছালো প্রতিবেদন দাখিলের সময়